হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রহঃ-র মূলনীতি বোখারী-মুসলিমের চাইতেও শক্তিশালী

মোবারক হুসাইন বৃহঃ, 02 ডিসে., 2021
19

হাদীস গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে ইমামগণের প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু মূলনীতি ছিলো।যেগুলো তারা অনুসরণ করে চলতেন।মূলত এসব মূলনীতির উপর ভিত্তি করেই নির্ণীত হয়,কোন ইমামের কোন কিতাবের হাদীসের মান কোন পর্যায়ের।যেমন- ইমাম বোখারী রাহঃ-র সহীহ বোখারীতে অনুসৃত মূলনীতিসমুহ, ইমাম মুসলিম,আবু দাঊদ,তিরমিযী রহঃ-র মূলনীতি(যেগুলো তাঁরা তাদের সহীহ ও সুনান সংকলনের ক্ষেত্রে ফলো করেছেন)এর চাইতে কঠিন ছিলো।যার ফলে তাঁরা নিজেদের কিতাবে এমন অনেক হাদীস এনেছেন, যা ইমাম বোখারী রহঃকতৃক ফলোকরা মূলনীতিগুলোর বিচারে অনুত্তীর্ণ।

উল্লেখ্য, ইমাম বোখারী রহঃ তাঁর সহীহ বুখারী সংকলনের ক্ষেত্রে যেরূপ কঠিন শর্ত আরোপ করেছেন, তাঁর অন্যকোন রচনায় তেমনটা করেননি।যার ফলে তাঁর অন্যান্য রচনাবলীর অনেক বর্ণনাই সহীহ বুখারীর মানে উত্তীর্ণ নয়।
এই জায়গাটিতে এসে অনেক গায়রে মুকাল্লিদ ভাইয়েরা খেয়ানতের আশ্রয় নেন।ড. আসাদুল্লাহ আল-গালিব, মুজাফফর বিন মুহসিন সাহেবরাও তাদের রচনাবলীর অনেক জায়গায় রিওয়ায়াত উল্লেখ করে ব্র‍্যাকেটে "বোখারী" লিখে সাধারণ পাঠকদের এই ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, এটা সহীহ বোখারীতে আছে।অথচ ইমাম বুখারী রহঃ এটা তাঁর কোন "জুয"এ উল্লেখ করেছেন।আমরা জানি, এক্ষেত্রে মুহাদ্দেসিনে কেরামগণ
رواه البخاري في جزء رفع اليدين কিংবা في جزء القراءة خلف الإمام ইত্যাদি বলে খোলাসা করে দেন।

আরো উল্লেখ্য, ইমাম বোখারীর এসব মূলনীতির প্রত্যেকটিই অন্যদের চাইতে উচ্চাঙ্গের,এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই।বরং ব্যাপারটি আপেক্ষিক।তাই দেখা যায় ইমাম নাসায়ী রহঃকতৃক ফলোকরা কিছু মূলনীতি ইমাম বোখারী মুসলিম রহঃ-র চাইতে এগিয়ে।যেমন-
ইমাম নাসায়ী রহঃ তাঁর সুনানে বেদ'আতী রাবীর বর্ণনা একেবারেই গ্রহণ করেননি।অপরদিকে বোখারী-মুসলিমে কিছু শর্তসাপেক্ষে তাদের থেকেও হাদিস গ্রহণকরা হয়েছে।তাই এইদিক থেকে অবশ্যই ইমাম নাসায়ী তাঁদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন।

যাইহোক আমরা সবাই একথা জানি যে,ইমাম বোখারী রহঃ-র অনুসৃত মূলনীতি খুবই কঠিন।অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এর ধারে কাছেও নেই।তাঁর সহীহ কিতাবটি কোরআনের পর দুনিয়ার সবচে' বিশুদ্ধ কিতাব।ব্লা...ব্লা...
কিন্তু যে বিষয়টি আমরা অনেকেই জানিনা তাহলো,
হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমাম আ'যম আবু হানীফা রহঃ-র মূলনীতি ইমাম বোখারী-মুসলিমের চাইতেও অনেক বেশী কঠিন ও সাবধানতাপূর্ণ।
তাইতো আলী ইবনুল জা'দ রহঃ বলেন,
.أبو حنيفة إذا جاء بالحديث،جاء به مثل الدر
আবু হানীফা রহঃ যখন কোন হাদীস সামনে নিয়ে আসেন,তা হয় মোতির মতো।
(জামিউ মাসানিদিল ইমাম আল-আ'যম-২/৩০৮)।

চলুন কিছু নমুনা দেখে নেয়া যাক-

১.বর্ণনাকারী নিজ শায়খ থেকে হাদীস শোনার পর হতে আপন ছাত্রদেরকে শেখানো পর্যন্ত পুরোটা সময় সেই হাদীসটি নিজের মস্তিষ্কে ধারণ করতে হবে।মাঝখানে কিছু সময়ের জন্যেও ভুলে যাওয়া চলবেনা।

২.রাবী যদি নিজের নোটখাতা দেখে হাদীস বর্ণনা করতে চায় তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই তার এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে,এটি সে তার শায়খ থেকে শুনেছে।অর্থাৎ শুধু নিজের লেখার মতো লেখা দেখেই তা থেকে বর্ণনা করতে পারবেনা।

৩.খবরে ওয়াহেদ সামনে আসলে তা কিতাবুল্লাহরعمومات (ব্যাপক ও সার্বজনীন আহকাম) ও ظواهر(দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট আহকাম)এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।যদি দেখা যায়,এগুলো হাদীসটিকে সাপোর্ট করছে তবে তা গ্রহণ করা হবে।অন্যথায় হাদীসটিকে মা'লুল সাব্যস্ত করা হবে।

৪.এমনিভাবে হাদীসটি সাহাবা ও তাবেয়ীগণের
"আমালে মুতাওয়ারাস"(প্রজন্ম পরম্পরায় ধারাবাহিকভাবে চলে আসা আমল)এর বিপরীত না হতে হবে।

৫." উমুমুল বালওয়া" (অর্থাৎ এমন বিষয় যা,সবারই বারবার প্রবল প্রয়োজন হয়) এর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র
খবরে ওয়াহেদ পাওয়া যাওয়া যথেষ্ট নয়।বরং এর জন্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকদের থেকে বর্ণনা পাওয়া যেতে হবে।

৬.শরীয়তের "হুদুদ" ও "কিসাস"এর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে যে বর্ণনাটি সর্বাধিক সাবধানতাপূর্ণ ও মানুষের জন্যে অধিক সহজ, তা গ্রহণ করা।

৭.বর্ণনাটি খবরে ওয়াহেদ হলে তা কোন (ক্বাওলী বা ফে'লী) মাশহুর সুন্নাহের বিপরীত হতে পারবেনা।

৮.হাদীসের বর্ণনাকারী তাঁর বর্ণনার বিপরীত আমল না করা।কেননা এটা হাদীসটি তাঁর নিকট মানসুখ হওয়াকে প্রমাণ করে।যেমন-আবু হুরাইরা রাঃ কতৃক বর্ণিত কোন পাত্রে কুকুর মুখ দিলে তা সাতবার ধৌত করার হাদীসের উপর ইমাম আবু হানীফা রহঃ আমল করেননি।কেননা আবু হুরাইরা রাঃ-র ফাতওয়া এর বিপরীত ছিল।তিনি তিনবার ধৌত করার ফাতওয়া দিতেন।
তাঁর মত একজন সাহাবী নিজের বর্ণিত হাদীসের বিপরীত আমল করবেন,এটা অসম্ভব যদি না তাঁর কাছে এর চাইতেও শক্তিশালী কোন দলিল থাকে।

৯.যে হাদীসের সপক্ষে সালাফের আসার বেশী পাওয়া যায় তাকে অন্যান্য বর্ণনার উপর প্রাধান্য দেয়া।

১০.হাদীসটির বিপরীতে এমন কোন বর্ণনা পাওয়া না যাওয়া, যা সিহহত ও আমলের বিচারে তার চেয়ে শক্তিশালী বা একই মানের।
এক্ষেত্রে তিনি তারজিহ বা একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দিতেন।এর অনেক পদ্ধতি রয়েছে।তন্মধ্যে কিছু ইমাম হাযেমী রহঃ(মৃঃ৫৮৪ হিঃ) তার "الاعتبار في الناسخ والمنسوخ من الآثار"এর মাঝে তুলে ধরেছেন,এর সঙ্গে আরো কিছু যোগ করেছেন ইরাকী রহঃ(মৃঃ৮০৬হিঃ),সেগুলোর সঙ্গে আবার আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী রহঃ(মৃঃ৯১১হিঃ) তার تدريب الراوي-তে আরো কিছু যোগ করেছেন।সর্বশেষ ইমাম শাওকানী রহঃ সবাইকে ছাড়িয়ে তার "إرشاد الفحول إلى تحقيق الحق من من علم الأصول" এর মাঝে প্রায় ১৬২ টি পদ্ধতি উল্লেখ করেন।
(একথাগুলো এখানে বলার উদ্দেশ্য, একটা ভুল বুঝাবুঝির অপনোদন।আমরা অনেকেই মনে করি কোন হাদিস বুখারী বা মুসলিমে থাকলেই সেটাকে অন্যান্য হাদিসের উপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।অথচ কোন হাদিস বুখারী-মুসলিমে থাকলে সেটাকে অগ্রাধিকার দেয়া উপরোক্ত ১৬২টি পদ্ধতির একটি পদ্ধতি মাত্র।এপ্রসঙ্গে মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের শারহে নুখবার শরাহ "تنقيح الفكر"র মাঝে
"فكرة الاكتفاء بالصحيحين"
শিরোনামে আরো অনেক যুক্তি সহকারে একটি সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা আছে।আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।)

১১.হাদীসটির ব্যাপারে সালাফ থেকে প্রামাণ্য  ত্বা'ন(অভিযোগ) পাওয়া না যাওয়া।

১২.হাদীসটি নুসুসে শারইয়্যাহ থেকে থেকে উৎসারিত কোন মূলনীতির বিপরীত না হওয়া।এক্ষেত্রে তিনি হাদীসটি বাদ দিয়ে সে মূলনীতির উপরই আমল করেন।এসকল মূলনীতি যেহেতু কোরআন সুন্নাহ থেকেই উৎসারিত, তাই তিনি এই হাদীসটিকে "শায"(বিচ্ছিন্ন) হিসেবে গণ্য করেন।আর আমরা সবাই জানি,শায না হওয়া হাদীস সহীহ হওয়ার পূর্বশর্ত।
ইমাম তহাবী রহঃকৃত "শারহু মা'আনিল আসার" অধ্যয়ন করলে এর অনেক নমুনা পাওয়া যাবে।

১৩.সিকাহ রাবীদের মুরসাল বর্ণনা গ্রহণ করা; যখন তার চাইতে শক্তিশালী কোন দলিল পাওয়া না যায়।

যাহেদ কাউসারী রহঃ(মৃঃ ১৩৭১হিঃ) তাঁর "তানিবুল খতিব"-এ বলেন,
"মুরসাল হাদিসের মাধ্যমে দলিল উপস্থাপন "সুন্নাতে মুতাওয়ারিসা"(প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা সুন্নাহ)।
খায়রুল কুরুনের লোকেরাও এর উপর চলেছেন।
এমনকি ইবনে জারির তাবারী রহঃ(মৃঃ ৩১০হিঃ) বলেন,
"নির্বিচারে মুরসাল হাদীস প্রত্যাখ্যান করা বিদআত, যা দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে প্রকাশ পেয়েছে।"
যেমনটা আবুল ওয়ালিদ বাজী রহঃ(মৃঃ ৪৭৪হিঃ) তাঁর 'ইহকামুল ফুসুল ফি আহকামিল উসুল'-এ, ইবনু আব্দিল বার রহঃ(মৃঃ ৪৬৩হিঃ) তাঁর 'তামহিদ'-এ,ইবনে রজব হানবালী রহঃ(মৃঃ ৭৯৫হিঃ)তাঁর 'শারহু ইলালিত তিরমিযি'-তে উল্লেখ করেছেন।
বরং আপনি ইমাম বোখারী রহঃকে পর্যন্ত দেখবেন তাঁর 'জুযউল ক্বিরাআত খালফাল ইমাম' ও অন্যান্য রচনার ন্যায় সহীহ বোখারীতেও মুরসাল হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করছেন।ইমাম মুসলিম রহঃ তো তাঁর সহীহ মুসলিমেই অনেক মুরসাল হাদীস নিয়ে এসেছেন।
এপ্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা আপনি আল্লামা শাব্বির আহমাদ উসমানী রহঃ(মৃঃ ১৩৬৯হিঃ) এর 'ফাতহুল মুলহিম'(১/৩৬) ও সুয়ুতী রহঃ(মৃঃ৯১১হিঃ)এর "তাদরিবুর রাবী" (পৃঃ১৩৫-১৩৬)তে পাবেন।
এরপর তিনি(কাউসারী রহঃ) বলেন,যে ব্যাক্তি শুধুমাত্র মুরসাল হওয়ার কারণে হাদীসকে জয়িফ সাব্যস্ত করে সে যেন সুন্নাহের বিশাল অংশকেই ছুড়ে ফেলে দেয়।'

তিনি আরো বলেন,যে ব্যাক্তি ইমাম আবু হানীফা রহঃএর ব্যাপারে এরকম ধারণা করে যে, তিনি হাদিস কম জানতেন বা হাদীসের প্রচুর বিরোধিতা করতেন কিংবা বেশীরভাগ যয়ীফ হাদীস গ্রহণ করতেন;সে মূলত হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমামগনের মূলনীতিগুলোই জানেনা।এবং মুজতাহিদ ইমামগণের 'ইলম' তার ত্রুটিপূর্ণ  ব্যাক্তিগত মানদণ্ড দিয়ে পরিমাপ করতে চায়!"

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

করোনা ভাইরাস, ছোঁয়াছে রোগ, তাওয়াক্কুল ও অন্যান্য

মোবারক হুসাইন · 02 ডিসে., 2021 · 14

"লা আদরী" বলতে পারা ইলমের অর্ধেক

মোবারক হুসাইন · 02 ডিসে., 2021 · 47

ইখতিলাফ কি শুধু ফুকাহাদের মাঝেই ছিলো?

মোবারক হুসাইন · 02 ডিসে., 2021 · 21