আক্বিদা

শিরক নিয়ে শোরগোল

ইজহারুল ইসলাম শুক্র, 17 ফেব., 2023
19

শিরক - বিদয়াত ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেন, এমন অনেককে এগুলোর পরিচয় জিজ্ঞেস করে অনেকটা হতাশ হয়েছি। এর কারণ হলো, অধিকাংশই এগুলোর সঠিক পরিচয় না জেনে নানা রকম বিভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে। মুসলমানদের মাঝে বিরাজমান অনেক বড় বড় ফেতনার মূল কারণও তাওহীদ ও শিরকের সঠিক পরিচয় না জানার কারণে হয়েছে। এখনও এই ধারা চলমান আছে।

এজন্য এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলা এখন সময়ের দাবী।

কাউকে যদি জিজ্ঞেস করি, শিরক কী জিনিস? তাদের সাধারণ উত্তর থাকে,

আল্লাহর সাথে শরীক করা।

স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী প্রশ্ন থাকে, কীসে আল্লাহর সাথে শরীক করা?

তখন অনেকে বলে, আল্লাহর গুণ, কর্ম, ইবাদত ইত্যাদিতে আল্লাহর সাথে শরীক করা।

এই পর্যন্ত অনেকে বলতে পারে। এরপর যদি জিজ্ঞেস করি, কীভাবে বোঝা যাবে যে, আল্লাহর গুণ আর বান্দার গুণের মাঝে শরীক করা হয়েছে? আল্লাহর গুণ আর সৃষ্টির গুণের মাঝে পার্থক্য কীভাবে হবে?

এই জায়গায় এসে মোটামুটি অনেকেই আটকে যায়। এরপর আমি জিজ্ঞেস করি,

১। দেখুন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহর গুণ হিসেবে রহীম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বিসমিল্লাহ এর মধ্যেই রহীম গুণটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা ফাতিহার আর-রহমানির রহীম, এখানে রহীম শব্দটি আল্লাহর জন্য গুণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

আবার পবিত্র কুরআনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও রহীম বলা হয়েছে। যেমন সূরা তাওবার ১২৮ নং আয়াত,

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ (128)

এখানে আসলে শুধু রহীম নয়, রউফুন আল্লাহর গুণবাচক নাম। সেটিও নবীজীর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আজীজ আল্লাহর নাম। সেটিও নবীজীর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে এমন তিনটি গুণবাচক শব্দ এখানে নবীজীর জন্যও হুবহু একই শব্দে ব্যবহার করা হয়েছে।

তাহলে কী কুরআন আমাদেরকে নাউজুবিল্লাহ শিরক শিক্ষা দিচ্ছে?

২। পবিত্র কুরআনে আল্লাহর গুণ হিসেবে সামী (শ্রোতা), বাসীর (দ্রষ্টা) শব্দ দু'টি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ একই গুণ মানুষের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন সূরা দাহরে রয়েছে,

هَلْ أَتَى عَلَى الإنْسَانِ حِينٌ مِنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَذْكُورًا ۝ إِنَّا خَلَقْنَا الإنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا ۝

অর্থ: মানুষের উপর এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন।

এখানে আল্লাহর জন্য ব্যবহার হওয়া 'সামী', 'বাসীর' গুণবাচক শব্দ দু'টি হুবহু বান্দা বা মানুষের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে কি নাউজুবিল্লাহ কুরআনে আল্লাহ ও বান্দার গুণের মাঝে শিরক করা হয়েছে?

৩। আল্লাহর আরেকটি গুণবাচক নাম হলো 'আলীম'। অথচ এটি হুবহু একই শব্দে পবিত্র কুরআনে বান্দার জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন، সূরা যারিয়াতে হযরত ইব্রামী আ: এর স্ত্রীকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে একজন আলীম ছেলের।

فَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً ۖ قَالُوا لَا تَخَفْ ۖ وَبَشَّرُوهُ بِغُلَامٍ عَلِيمٍ

অর্থ: অতঃপর তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হলঃ তারা বললঃ ভীত হবেন না। তারা তাঁকে একট জ্ঞানীগুণী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল।

এখানে কি তাহলে আল্লাহর গুণবাচক নাম আলীম বান্দার জন্য ব্যবহার করে শিরক হয়েছে নাউজুবিল্লাহ?

কুরআনের অন্য জায়গায় আছে,

وفوق كل ذي علم عليم

এরকম হালীম আল্লাহর গুণবাচক নাম। আবার ইসমাইল আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও হালীম বলা হয়েছে। যেমন,

فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ

এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে, যেখানে আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো হুবহু বান্দার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কী শিরক হয়েছে? যদি শিরক না হয়ে থাকে, তাহলে কেন শিরক নয়? আপনি যে বললেন, আল্লাহর গুণ অন্যের জন্য সাব্যস্ত করা শিরক, তাহলে এসব ক্ষেত্রে শিরক নয় কেন? আর গুণের ক্ষেত্রে শিরক হওয়া বা না হওয়ার পার্থক্যই বা কীভাবে করা হবে?

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কারণ, তারা শিরক বিষয়ে অনেক শোরগোল করলেও শিরকের বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে অন্য সবার থেকে পিছিয়ে।

 

গুণের ক্ষেত্রে শিরকের বিষয়টি নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়ে যাওয়ার পর যদি কর্মের ক্ষেত্রে শিরক নিয়ে আলোচনা তুলি, তাহলে এখানেও কুল-কিনারা করতে পারেন না। কিন্তু মৌলিক বিষয়গুলো বলতে না পারলেও শিরক নিয়ে তাদের শোরগোল কিন্তু থেমে নেই।

যদি জিজ্ঞেস করি, আপনি যে বলেছেন, গুণ, কর্ম ও ইবাদতে আল্লাহর শরীক করা। গুণের বিষয় তো সুরাহা করতে পারলেন না। তো এবার কর্মের বিষয়ে বলেন। কর্মে আল্লাহর সাথে শরীক করার অর্থ কী?

বলে, আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কাজ বান্দার জন্য সাব্যস্ত করা হলো কর্মের শিরক।

জিজ্ঞেস করি, এরকম দু'একটি শিরকের উদাহরণ দিন।

বলে, সন্তান দেয়া, সৃষ্টি করা, জীবন - মৃত্যু দেয়া ইত্যাদি।

আমি বললাম, উপরের সবগুলো বিষয়ই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া মাখলুকের জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিছু উদারহণ দিলেই স্পষ্ট হবে। আল্লাহ তায়ালার কর্ম অন্যের জন্য সাব্যস্ত করে কি তাহলে কুরআনে নাউজুবিল্লাহ আমাদেরকে শিরক শেখান হয়েছে?

আপনাদের উদারহণ দেয়া কর্মগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্যের ক্ষেত্রে ব্যবহারের কিছু নমুনা

১। হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম এর ঘটনা পবিত্র কুরআনের সূরা মারইয়ামে এসেছে।

فَاتَّخَذَتْ مِن دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا

অতঃপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করলো। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পুর্ণ মানবাকৃতিতে আত্নপ্রকাশ করল।

قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَـٰنِ مِنكَ إِن كُنتَ تَقِيًّا

মারইয়াম বললঃ আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহভীরু হও।

قَالَ إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا

সে বললঃ আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তা প্রেরিত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব।

এখানে সন্তান দেয়ার ক্ষেত্রে জিবরীল আলাইহিস সালাম নিজের দিকে সন্তান দেয়ার কর্মকে সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আপনাকে পবিত্র সন্তান দিব। সন্তান দেয়ার কর্মকে সরাসরি নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন।

আল্লাহর কর্ম জিবরাইল আলাইহিস সালাম নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে কি কর্মের মাঝে শিরক করেছেন? যদি বলেন, হ্যাঁ। তাহলে কুরআন নাউজুবিল্লাহ শিরক শিক্ষা দিয়েছে। আর যদি না বলেন, তাহলে কর্মের মধ্যে শিরক হচ্ছে কি না সেটা কীভাবে পার্থক্য করা হবে? কোন কর্মটা শিরক আর কোনটা শিরক নয় সেটা কীভাবে বোঝা যাবে?

২। আপনি উপরে সৃষ্টির কথা বলেছেন। অথচ সৃষ্টি করার কথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যেও পবিত্র কুরআনে ব্যবহার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আপনার উদাহরণ দেয়া অনেকগুলো কর্মের ক্ষেত্রে ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, আমি এগুলো আল্লাহর অনুমতিতে করি। যেমন, সূরা আল-ইমরানের ৪৯ নং আয়াতে রয়েছে,

وَرَسُولًا إِلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ ۖ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُم مِّنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ ۖ وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِي الْمَوْتَىٰ بِإِذْنِ اللَّهِ ۖ وَأُنَبِّئُكُم بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

আর বণী ইসরাঈলদের জন্যে রসূল হিসেবে তাকে মনোনীত করবেন। তিনি বললেন নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে এসেছি নিদর্শনসমূহ নিয়ে। আমি তোমাদের জন্য মাটির দ্বারা পাখীর আকৃতি তৈরী করে দেই। তারপর তাতে যখন ফুৎকার প্রদান করি, তখন তা উড়ন্ত পাখীতে পরিণত হয়ে যায় আল্লাহর হুকুমে। আর আমি সুস্থ করে তুলি জন্মান্ধকে এবং শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে। আর আমি জীবিত করে দেই মৃতকে আল্লাহর হুকুমে। আর আমি তোমাদেরকে বলে দেই যা তোমরা খেয়ে আস এবং যা তোমরা ঘরে রেখে আস। এতে প্রকৃষ্ট নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।

এখানে ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি সৃষ্টি করে সেখানে ফুৎকার দেই। আর সেটি আল্লাহর অনুমতিতে পাখি হয়ে যায়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি এখানে খালক বা সৃষ্টি শব্দ ব্যবহার করেছেন। একইভাবে মৃতকে জীবিত করার কথাও বলেছেন। একইভাবে তিনি গায়েবের বিষয়ও বলতে পারেন। যেমন, তোমরা কী খাও, আর ঘরে কী সঞ্চয় করো, সেগুলোও আমি আল্লাহর অনুমতিতে বলে দিতে পারি।

এখন মৌলিকভাবে এসব কর্ম আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়, তাহলে ঈসা আলাইহিস সালাম বা অন্য কারও দ্বারা সেগুলো সংগঠিত হওয়া শিরক। আপনি হযত বলবেন, এগুলো তো তিনি আল্লাহর অনুমতিতে করেছেন। তখন প্রশ্ন থাকে, আল্লাহ তায়ালা কি ঈসা আলাইহিস সালাম বা অন্য কাউকে শিরক করার অনুমতি কখনও দিবেন? মৌলিকভাবে বিষয়গুলো যদি শিরকই হয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা কী শিরক করার অনুমতি দেন? আর যদি মৌলিকভাবে কর্মগুলো যদি শিরক না হয়, তাহলে আপনি উপরে এগুলোকে কর্মের শিরক কেন বললেন? আর কর্মের ক্ষেত্রে শিরক হচ্ছে কি না সেটা বোঝার মানদন্ডই বা কি?

৩। উপরে ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর অনুমতিতে মৃতকে জীবিত করার কথা বলেছেন। এর উল্টোও কুরআনে আছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ۖ فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَىٰ عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَىٰ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ ছাড়েন না এবং অন্যান্যদের ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।

এই আয়াতসহ কুরআনের বহু আয়াতে জান-কবজ ও মৃত্যুকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

আবার একই কাজ (জান-কবজ) বা মৃত্যুকে আল্লাহ ছাড়া অন্য মাখলুকের দিকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

قُلْ يَتَوَفَّاكُم مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ

বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।

সূরা সাজদাহ, আয়াত-১১।

এখানে জান-কবজের কাজকে ফেরেশতাদের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এখন আল্লাহর কর্মকে ফেরেশতাদের দিকে সম্পৃক্ত করাতে কি কর্মের শিরক হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে কর্মের শিরক জিনিসটা কী? আপনার উপরের বক্তব্য অনুযায়ী এগুলো কর্মের শিরক হওয়ার কথা?

আপনি হয়ত বলবেন, ঈসা আলাইহিস সালাম বা ফেরেশতাদের কর্মগুলো রুপক। এখন প্রশ্ন আসবে, রুপক অর্থেও কি আল্লাহর সাথে শিরক করার অনুমতি আছে? এখানে রুপক বলতে কী উদ্দেশ্য? আপনার বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, এমন কিছু কর্ম রয়েছে যেগুলো আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। সেগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও থেকে প্রকাশিত হলে আপনি এটাকে কর্মের শিরক মনে করছেন। অথচ আমরা দেখছি, এই কাজগুলো পবিত্র কুরআনেই বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ ছাড়া অন্য থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা আছে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, নাউজুবিল্লাহ পবিত্র কুরআন আমাদেরকে কর্মের শিরক শিক্ষা দিয়েছে। আর যদি বিষয়টি এমন না হয়, তাহলে কর্মের শিরকের বাস্তবতা তাহলে কী? কীভাবে পার্থক্য করা হবে যে, কোন কর্মটা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করলে তাওহীদ, আর কোনটা আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টির দিকে সম্পৃক্ত করলে শিরক?

উভয়ের মাঝে পার্থক্যের মানদন্ডটা আসলে কী?

এখানে এসে তিনি আটকে যান। যদিও তিনি সুযোগ পেলে শিরক নিয়ে শোরগোল করতে পিছপা হন না।

 

শিরক নিয়ে শোরগোলকারীদের এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অজ্ঞতা প্রকাশ পায় ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরক নিয়ে আলাপ তুললে। মজার বিষয় হলো, এসব জাহেল নিজেদের অজ্ঞতা বুঝতে না পেরে চরম গোঁড়ামী করে অন্যদেরকে তাদের জাহালাতের উপর একমত হওয়ার দাওয়াত দেয়। নিজেদের জাহালাত সংশোধন না করে উল্টো অন্যকে তাকফীর, তাবদী, কাফের-মুশরিক ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে থাকে। এসব বিষয়ে এরা কী পরিমাণ জাহেল, তার কিছু নমুনা আলাপ করা যাক।

আপনি বলেছিলেন, আল্লাহর সাথে তার গুণ, কর্ম ও ইবাদতের ক্ষেত্রে অংশীদার স্থাপন করা হলো শিরক।

গুণ ও কর্মের ক্ষেত্রে শিরক বিষয়ক আপনার অবস্থান তো আগেই স্পষ্ট হয়েছে। এবার বলুন, ইবাদতের শিরক করার অর্থ কী?

ইবাদতে শিরক হচ্ছে কি না এটা আমরা পরে বুঝব। আগে এটা বলুন, ইবাদত কাকে বলে? ইবাদত কোন জিনিসের নাম? ইবাদতের সঠিক সংজ্ঞা ও পরিচয় আগে দিন। এরপর ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরক কেন হয়, কীভাবে হয় সেটা এরপর আমরা বোঝার চেষ্টা করব। আগে বলুন, ইবাদত কী জিনিস?

অধিকাংশ আলাপে এই প্রশ্নের পর থেকেই আমতা আমতা শুরু হয়। ইবাদতের পরিচয় দেয়াটাই তাদের জন্য বড় ধরণের মুসিবত হয়ে দাঁড়ায়।

কেউ কেউ বলে, ইবাদত কী বোঝেন না? নামাজ - রোজা এগুলোই তো?

জিজ্ঞেস করি, এগুলোর বাইরে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সহ অন্যান্য শত শত ধর্মের লোকেরা যা করে সেগুলো ইবাদত না?

বলে, হ্যাঁ, সেগুলোও তো ইবাদত।

তাহলে এবার বলুন, ইবাদত কী জিনিস? ইবাদতের পরিচয় আসলে কী?

কেউ বলে, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যা করতে বলেছেন এবং আমাদেরকে যা থেকে নিষেধ করেছেন, সেগুলো মেনে চলাই ইবাদত।

আমি বললাম, এটা তো আগের মতই হলো।

হিন্দু, বৌদ্ধরা যেসব ইবাদত করে সেগুলোর কোনটাই তো আল্লাহ করতে বলেননি, তাহলে তাদেরটা কীভাবে ইবাদত হয়? নাকি তারা ইবাদতই করে না? অথচ কুরআনের জায়গায় মুশরিকদের ইবাদতকে ইবাদতই বলা হয়েছে। সূরা কাফিরুন দেখলেই বুঝতে পারবেন।

এদের মধ্যে যাদের একটু জানা-শোনা আছে, এরা বলে,

ইবাদতের অর্থ হলো গায়াতুল খুজু ওয়াত তাজাল্লুল। বা চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতার নাম হলো ইবাদত।

এখন প্রশ্ন হলো, বিনয় ও নম্রতা যে চূড়ান্ত হয়েছে সেটা কীভাবে বোঝা যাবে?

আবার যেসব ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিনয় প্রকাশ পায় কিন্তু এর চেয়েও বেশি বিনয় প্রকাশ পেতে পারে সেগুলো ইবাদত নয়?

যেমন ধরেন, সিজদা করাকে চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতার আলামত হিসেবে ধরলে রুকু করা কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা সিজদার তুলনায় চূড়ান্ত বিনয় নয়। তাহলে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা রুকু করা সিজদার তুলনায় চূড়ান্ত বিনয় নয়। আবার সিজদার চেয়ে জমিনে কপাল, মাথা ও পুরো শরীর ঠেকিয়ে শুয়ে পড়া (যেমন অনেক হিন্দু করে) চূড়ান্ত বিনয় ধরলে সিজদাও সে অনুযায়ী চূড়ান্ত বিনয় নয়। সে হিসেবে সিজদা চূড়ান্ত বিনয় না হওয়াই ইবাদত বলে গণ্য হবে না।

এরকম আরও অনেক প্রশ্ন করা যাবে। তাহলে আপনার কাছে চূড়ান্ত বিনয় আর নম্রতার মানদন্ড কী থাকল? সেটা স্পষ্ট করুন।

এখানে এসে মোটামুটি আলোচনা আটকে যায়। সামনে আর তেমন আগায় না।

যদি জিজ্ঞেস করি, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহর জন্য ভয় করা, কিংবা আল্লাহর জন্য রাগান্বিত হওয়া এগুলো তো ইবাদত?

বলে, হ্যাঁ। এগুলো ইবাদত।

তাহলে বলুন, ভালোবাসা, ভয় বা রাগের ক্ষেত্রে শিরক হচ্ছে কি না সেটা কীভাবে পার্থক্য করা যাবে? কোন ভালোবাসা ইবাদত হবে আর কোন ভালোবাসা ইবাদত নয় সেটা কীভাবে বোঝা যাবে?

ধরেন, একজন মজনুর মতো প্রেমে পড়ে পাগল হয়ে গেল কিংবা প্রেমে পড়ে মারাই গেল। এখানে তো দেখা যাচ্ছে, ভালোবাসার চূড়ান্ত বহি:প্রকাশ হয়েছে। তাহলে এটা কি শিরক হয়েছে?

আবার ধরেন, কেউ সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ বাঘের কবলে পড়ে ভয়ে মারা গেল কিংবা ভয়ে পাগল হয়ে গেল। এটা কি শিরক হবে? কারণ, এখানে চূড়ান্ত ভয় প্রকাশ পেয়েছে ধরা যায়।

আবার, আমরা সাধারণত: সিজদাকে চূড়ান্ত বিনয় প্রকাশ মনে করে থাকি। যদি মূল কাজ বা সিজদাকে মৌলিকভাবে ইবাদত মনে করা হয়, তাহলে বলতে হবে, আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে আদেশ করেছিলেন, আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করতে। আপনার সংজ্ঞা অনুযায়ী এর অর্থ হলো, নাউজুবিল্লাহ আদম আলাইহিস সালামের ইবাদত করার আদেশ করেছিলেন আল্লাহ তায়ালা। এই আদেশ মান্য করে আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করে সমস্ত ফেরেশতা শিরক করে মুশরিক হয়ে গেছে নাউজুবিল্লাহ। আপনার কথা অনুযায়ী, নাউজুবিল্লাহ, এই শিরকী আদেশ একমাত্র অমান্য করে একমাত্র তাওহীদবাদী হয়েছে ইবলিস।

আবার সিজদাকে মৌলিকভাবেই যদি ইবাদত মনে করেন, তাহলে বলতে হবে হযরত ইউসুফ আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা-মাতা ও ভাইয়েরা তার সামনে সিজদা করে সবাই শিরক করেছে। নাউজুবিল্লাহ।

এরকম জাহেল মৌলভীদের অনেকে শুধু দাঁড়ান, কিংবা বসা, বা ঝোঁকা এগুলোকেই মৌলিক ইবাদত মনে করে। অথচ এসব জাহেলরা ভালো করে চিন্তা করলে বুঝত, দাঁড়িয়ে বা কিয়াম করে যেমন আমরা ইবাদত করি, একইভাবে ঝুঁকে, বসে, এমনকি শুয়েও ইবাদত হয় বা হতে পারে। তাহলে সর্ব-অবস্থায় শিরকের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। শুধু দাঁড়ালে বা ক্বিয়াম যদি ইবাদত হয়, তাহলে কুউদ, রুকু, এমন কি শুয়েও তো ইবাদত হয়। জাহেলদের মূল সমস্যা হলো, ইবাদত কেন হয় এবং কেন হয় না, এইটার পার্থক্য করতে পারে না। কারণ, এরা আসলে অনেক গলাবাজী করলেও ইবাদতের সঠিক সংজ্ঞা জানে না।

বিনয়ের সাথে কারও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যদি মৌলিভাবে ইবাদত হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টের সামনে, প্রধানমন্ত্রী বা রাজা-বাদশাহের সামনে যে গার্ডেরা ঘন্টার পর ঘন্টা বিনয়ের সাথে দাঁড়িয়ে থাকে, তারা সবাই তাদের ইবাদত করে?

ইবাদতের শিরক বোঝা তো অনেক পরের বিষয়, এরা আসলে মারাত্মক গলাবাজী ও শোরগোল করলেও বাস্তবে ইবাদতের সঠিক সংজ্ঞা ও পরিচয়ই জানে না।
 

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 684
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83