আক্বিদা

ইমাম বোখারী রহ. সম্পর্কে নাসীরুদ্দীন আলবানী রহ: এর আপত্তিকর অভিযোগ ও তার জবাব

ইজহারুল ইসলাম রবি, 12 সেপ্টে., 2021
23

ইমাম বোখারী রহ. এর ব্যক্তিত্ব ও ইসলাম ও মুসলমানদের মাঝে তার অবস্থান কারও অজানা নয়। হাদীস শাস্ত্রের অদ্বিতীয় এই ইমামের খেদমতকে আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে কবুল করেছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত  সকল মুসলমান তার কাছে ঋণী।

উলামায়ে কেরামের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ ও মতানৈক্য একটি স্বত:সিদ্ধ বিষয়। ইজতেহাদ ও মাসআলা আহরণের ক্ষেত্রে এটি দোষণীয় হওয়ার পরিবের্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় বিবেচিত হয়। ইমাম বোখারী রহ. এর সাথে যুগে যুগে বিভিন্ন উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন। এটি যেমন ইমাম বোখারীর সুউচ্চ মর্যাদার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলে না, তেমনি মতানৈক্য করা দোষণীয় সেটাও প্রমাণ করে না। উলামায়ে কেরামের মাঝে অধিকাংশ মতানৈক্য ফিকহী মাসআলা-মাসাইল ও শাখাগত বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ। আক্বিদাগত বিষয়ে মেৌলিকভাবে কোন মতানৈক্য না হওয়াই শরীয়তের নির্দেশ। আক্বিদার ক্ষেত্রেও সামান্য মতানৈক্য হতে পারে, কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্তর্ভূক্ত কাউকে এই সামান্য মতানৈক্যের কারণে কাফের-মুশরিক, বিদআতী, গোমরাহ, মুলহিদ, যিন্দিক বা এজাতীয় গর্হিত শব্দ ব্যবহার কোনভাবেই কাম্য নয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত পূর্ব থেকেই এই নীতিমালা অনুসরণ করে আসছে।

শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহ: ইমাম বোখারী রহ. এর সাথে অসংখ্য মাসআলায় মতানৈক্য করেছেন। কিন্তু একারণে তিনি সমালোচিত হবেন না এবং এটাকে দোষণীয় মনে করার কিছু নেই। শায়খ আলবানী বোখারী শরীফের বেশ কয়েকটি হাদীসকে যয়ীফ বলেছেন, কিন্তু একারণেও শায়খ আলবানীর সমালোচনা করা হবে না বরং ইলমী আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করা হবে।

আক্বিদা বিষয়ে যদিও কোন ধরণের মতানৈক্য গ্রহণযোগ্য নয, কিন্তু এক্ষেত্রে আলবানী সাহেব অনেক উলামায়ে কেরামের সাথে মতানৈক্য করেছেন। এমনকি সউদীর বিখ্যাত শায়খ ইবনে বায রহ. ও সালেহ আল-উসাইমিন রহ. এর সাথে আক্বিদার ক্ষেত্রে তার অনেক মতানৈক্য রয়েছে।

এ বিষয়ে ড. সায়াদ আল বারীক এর লেখা আল-ই’জায ফি বা’যি মাখতালাফা ফিহিল আলবানী ও ইবনে উসাইমিন ও ইবনে বায নামক কিতাবে আলোচনা করা হয়েছে। একইভাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার সাথে অনেক বিষয়ে আলবানী সাহেবের আক্বিদাগত বিরোধ রয়েছে। এ্ই বিরোধগুরো খুব সাধারণ বিষয়ে নয়, বরং এগুলোর কারণে যে কোন একজনকে গোমরাহ বলা খুবই সহজ ব্যাপার। এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, শায়খ হাসান বিন আলী আস সাক্কাফ তার আল-বিশারতু ওয়াল ইতহাফ ফিমা বাইনা ইবনে তাইমিয়া ওয়াল আল-বানী ফিল আক্বিদাতি মিনাল ইখতেলাফ নামক বইয়ে। আক্বিদা বিষয়ে আলবানী সাহেব নিজের ঘরানা আলেমদের সমালোচনা না করলেও ইসলামের ইতিহাসে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত হিসেবে খ্যাত আশআরী ও মাতুরীতিদেরকে ন্যাক্কারজনক ভাষায় আক্রমণ করেছেন। এই আক্রমণের অংশ হিসেবে বড় বড় ইমামগণও তাদেরও সমালোচনা থেকে মুক্ত থাকেনি। এ বিষয়গুলো বিস্তারিত তুলে ধরার জন্য পৃথক বইয়ের প্রযোজন।

বর্তমানে তথকথিত সালাফী আক্বিদার অনুসারীগণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আচরণ বিধি ও নীতি-মালার কোন তোয়াক্কা না করে খুবই সাধারণভাবে মানুষকে কাফের-মুশরিক ইত্যাদি আখ্যায়িত করে থাকে।  কাউকে কাফের মুশরিক বলা যেন এদের কাছে পানি ভাতের মতো। তাদের এই আচরণ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এগুলো তারা  সহীহ আক্বিদা অনুসরণের নামে করে থাকে।

এবার আমাদের মূল আলোচনায় আসা যাক। আলবানী রহ: ইমাম বোখারী এর সাথে কোন বিষয়ে মতানৈক্য করলে সেটা আলোচনার প্রযোজন ছিলো না, কিন্তু তিনি একটি আক্বিদার ক্ষেত্রে রীতিমত ইমাম বোখারীর সম্পর্কে এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য  শোভনীয় নয়। আক্বিদার ক্ষেত্রে তাদের এই তাকফীরি মনোভাব কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয এবং এটি কোনভাবেই ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর নয়।

আমরা এখানে প্রত্যেকটি বিষয় দলিল সহ স্ক্রিনশট দিয়ে আলোচনা করবো এবঙ প্রত্যেকটি বিষয়ে অনেক স্কিনশট থাকবে। এ ব্যাপারে সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে, আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার জন্য বিরক্ত হবেন না।

ইমাম বোখারী রহ. সম্পর্কে শায়খ আলবানীর বক্তব্য:

ইমাম বোখারী রহ. বোখারী শরীফের কিতাবুত তাফসীর তথা তাফসীর অধ্যায়ে সূরা ক্বাসাসের ৮৮ নং এর যে ব্যাখ্যা লিখেছেন, সেটা মূলত: আলবানী সাহেবের আক্বিদা ও নীতি-মালার বিরোধী হওয়ার কারণে ইমাম বোখারীর উপর আপত্তি করেছেন। আমরা শুরুতে নাসিরুদ্দিন আলবানী সাহেবের সম্পূর্ণ কথোপকথ উল্লেখ করবো।

মাকতাবাতুত তুরাসিল ইসলামী থেকে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত শায়খ আলবানীর ফতোয়া সঙ্কলন, ফতোয়াশ শায়ক আল-আলবানী এর ৫২২ ও ৫২৩ পৃ. স্কিনশট নিচে দেয়া হলো।

শায়খ আলবানীর উক্ত বক্তব্যটি তার মাকতাবাতু তুরাসিল ইসলামী যেমন প্রকাশ করেছে, তেমনি মাকতাবায়ে শামেলা শায়খের  উক্ত বক্তব্যটি দুরুসুন লিশ শায়খিল আলবানী নামক বইয়ে প্রকাশ করেছে। নিচের স্ক্রিনশটটি লক্ষ্য করুন:

দু’টি প্রকাশনীর কথা এজন্য উল্লেখ করলাম, শামেলাতে প্রকাশিত কথোপকথন এবং মাকতাবাতুত তুরাসিল ইসলামী কর্তৃক প্রকাশিত কথোপকথনের মাঝে অনেক  পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো,

১.মাকতাবাতুত তুরাসিল ইসলামী থেকে প্রকাশিত ফতোয়ায় প্রশ্নের  শুরুতে يا شيخ রয়েছে, কিন্তু শামেলাতে এটি নেই।

২.তুরাসিল ইসলামী তে রয়েছে, أنا بالأمس قد ذكرت مسألة أو কিন্তু শামেলাতে এই কথাটি নেই। বরং শুধু এভাবে রয়েছে,  أنا غفلت بالأمس عن ذكر هذه المسألة

৩.তুরাসুল  ইসলামীতে  আন মা’না রয়েছে, কিন্তু শামেলাতে মি মা’না রয়েছে।

৪.তুরাসুল ইসলামী থেকে প্রকাশিত বইয়ে রয়েছে, বি সারাহাতিন, কিন্তু শামেলাতে রয়েছে, সারাহাতান।

৫. তুরাসুল ইসলামী থেকে প্রকাশিত ফতোয়ায় রয়েছে, أن هذا الرجل إن شاء الله نقله صحيح  অথচ শামেলাতে রয়েছে, أن نقل هذا الرجل إن شاء الله صحيح

৬.তুরাসূল ইসলামীতে রয়েছে, মুমকিনুন কিন্তু শামেলাতে রযেছে, ইমকিনু।

৭.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, ولكن أريد أن أقرأ عليك علامة في هذا الكتاب অথচ শামেলাতে রয়েছে, ولكن أقرأ عليك كلامه في هذا الكتاب

৮.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, ফাহুয়া ইয়াকুলু কিন্তু শামেলাতে রযেছে, ইয ইয়াকুলু।

৯.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, আনা তবআন আল ইউম কিন্তু শামেলাতে রয়েছে, ফাআনাল ইউম রজা’তু।

১০.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, فما أعرف جوابكم কিন্তু শামেলাতে রয়েছে, فما جوابكم؟

১১.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, جوابي قدم سلفا কিন্তু শামেলাতে রয়েছে,  جوابي تقدم سلفاً

১২.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, أنت سمعت مني الشك শামেলাতে রয়েছে, أنت سمعت مني التشكيك

১৩.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, راجعت هذه العبارة শামেলাতে রয়েছে,  أني مرة راجعت هذه العبارة

১৪.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, ما في غير هذا কিন্তু শামেলাতে রয়েছে, ولا شيء غيرها

১৫.তুরাসুল ইসলামীতে রয়েছে, هذا يا أخي ما يجتاج إلي تدليل علي بطلانه কিন্তু শামেলাতে রয়েছে, هذا يا أخي! لا يحتاج إلى تدليل على بطلانه

একই মজলিশের আলোচনায় মাত্র দুই পৃষ্ঠায় এতগুলো পার্থক্য থাকা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু পার্থক্য সাধারণ পর্যায়ের এবঙ কিছু পার্থক্য একটু গুরুতর। যাই হোক আমরা দু’টি বিষয়ের স্ত্রিনশট উপরে উল্লেখ করেছি। বিজ্ঞ পাঠক উভয়ের মাঝে পার্থক্যগুলো লক্ষ্য করুন।  পরবর্তী আলোচনায় এই পার্থক্যগুলো আমাদের কাজে লাগবে।

আমরা এখানে শামেলা থেকে শায়খ আলবানীর সম্পূর্ণ কথোপকথন অনুবাদ সহ উল্লেখ করছি।

بيان قول البخاري في تفسير: (كل شيء هالك إلا وجهه)

السؤال

 لي عدة أسئلة، ولكن قبل أن أبدأ أقول: أنا غفلت بالأمس عن ذكر هذه المسألة، وهي عندما قلت: إن الإمام البخاري ترجم في صحيحه في معنى قوله تعالى: { كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ } [القصص:88] قال: إلا ملكه.

صراحة أنا نقلت هذا الكلام عن كتاب اسمه: دراسة تحليلية لعقيدة ابن حجر ، كتبه أحمد عصام الكاتب ، وكنت معتقداً أن نقل هذا الرجل إن شاء الله صحيح، ولازلت أقول: يمكن أن يكون نقله صحيحاً، ولكن أقرأ عليك كلامه في هذا الكتاب.

إذ يقول: قد تقدم ترجمة البخاري لسورة القصص في قوله تعالى: { كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ } [القصص:88]، أي: إلا ملكه، ويقال: (إلا) ما أريد به وجه الله، وقوله: إلا ملكه، قال الحافظ في رواية النسفي وقال معمر فذكره، و معمر هذا هو أبو عبيدة بن المثنى ، وهذا كلامه في كتابه مجاز القرآن ، لكن بلفظ (إلا هو)، فأنا رجعت اليوم إلى الفتح نفسه فلم أجد ترجمة للبخاري بهذا الشيء، ورجعت لـ صحيح البخاري دون الفتح ، فلم أجد هذا الكلام للإمام البخاري ، ولكنه هنا كأنه يشير إلى أن هذا الشيء موجود برواية النسفي عن الإمام البخاري ، فما جوابكم؟

الجواب

 جوابي تقدم سلفاً.

السائل: أنا أردت أن أبين هذا مخافة أن أقع في كلام على الإمام البخاري .

الشيخ: أنت سمعت مني التشكيك في أن يقول البخاري هذه الكلمة؛ لأن تفسير قوله تعالى: { وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالْأِكْرَامِ } [الرحمن:27] أي: ملكه، يا أخي! هذا لا يقوله مسلم مؤمن، وقلت أيضاً: إن كان هذا موجوداً فقد يكون في بعض النسخ، فإذاً الجواب تقدم سلفاً، وأنت جزاك الله خيراً الآن بهذا الكلام الذي ذكرته تؤكد أنه ليس في البخاري مثل هذا التأويل الذي هو عين التعطيل.

السائل: يا شيخنا! على هذا كأن مثل هذا القول موجود في الفتح ، وأنا أذكر أني مرة راجعت هذه العبارة باستدلال أحدهم، فكأني وجدت مثل نوع هذا الاستدلال، أي: أنه موجود وهو في بعض النسخ، لكن أنا قلت له: إنه لا يوجد إلا الله عز وجل، وإلا مخلوقات الله عز وجل، ولا شيء غيرها، فإذا كان كل شيء هالك إلا وجهه، أي: إلا ملكه، إذاً ما هو الشيء الهالك؟!! الشيخ: هذا يا أخي! لا يحتاج إلى تدليل على بطلانه، لكن المهم أن ننزه الإمام البخاري عن أن يؤول هذه الآية وهو إمام في الحديث وفي الصفات، وهو سلفي العقيدة والحمد لله

অনুবাদ:

প্রশ্ন:

আমার কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নগুলো শুরু করার পূর্বে আমি বলবো, আমি গতকাল এই মাসআলাটি আলোচনা করার সময় একটা বিষয় উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছি। বিষয়টি হলো, বোখারী শরীফে সুরা ক্বাসাসের ৮৮ নং আয়াত (আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে) এর ব্যাখ্যায় ইমাম বোখারী রহ. আল্লাহর চেহারা এর ব্যাখ্যা করেছেন আল্লাহ রাজত্ব (অর্থাৎ আল্লাহর রাজত্ব ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে)।

স্পষ্টত: আমি এই কথাটি একটি কিতাব থেকে উদ্ধৃত করেছি। কিতাবের নাম হলো, দিরাসাতুন তাহলীলিয়াতুন লিআকিদাতি ইবনে হাজার। কিতাবটি লিখেছেন, আহমাদ ইসাম আল-কাতিব। আমি বিশ্বাস করি, এই লোকটির উদ্ধৃতি ইনশাআল্লাহ সঠিক। আমি এখনও বলছি, তার উদ্ধৃতি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি আপনার সম্মুখে তার বক্তব্যটি উদ্ধৃত করছি। সে লিখেছে, [পবিত্র কুরআনের সূরা কাসাসের ৮৮ নং আয়াত তথা, আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে এর ব্যাখ্যায় ইমাম বোখারী রহ. এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর রাজত্ব ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা কিছু করা হয়েছে, তা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।

ইমাম বোখারী এর বক্তব্য [আল্লহর রাজত্ব ব্যতীত..] ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেছেন, [ইমাম বোখারী থেকে নাসাফী রহ. এর বর্ণনায় রয়েছে, وقال معمر (ইমাম মা’মার বলেছেন), অত:পর, ইমাম বোখারী রহ. উক্ত বক্তব্যটি উল্লেখ করেছেন। (অর্থাৎ নাসাফীর বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহর রাজত্ব ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, এটি ইমাম মা’মার এর বক্তব্য এবং তার উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম বোখারী এটা বর্ণনা করেছেন)। এখানে ইমাম মা’মার হলেন, আবু উবাইদা ইবনুল মুসান্না। ইমাম মা’মার  তার মাজাযুল কুরআনে এ সম্পর্কে লিখেছেন, তবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহ ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। ] (ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর বক্তব্য শেষ হলো)।

আমি আজ ফাতহুল বারী দেখেছি, কিন্তু ইমাম বোখারী রহ. এর বক্তব্যটি পাইনি এবং ফাতহুল বারী ছাড়া শুধু বোখারী শরীফ দেখেছি, সেখানেও পাইনি। তবে তিনি বোধ হয় ইঙ্গিত করেছেন যে, এটি ইমাম নাসাফীর বর্ণনায রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার উত্তর কী?

উত্তর:

আমার উত্তর পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্নকর্তা: আমি এটি উল্লেখ করেছি যেন ইমাম বোখারী রহ. এর ব্যাপারে কোন অমূলক কথা না বলি..

শায়খ: ইমাম বোখারী রহ. এ কথা বলেছেন কি না, এ ব্যাপারে আমার সন্দেহের বিষয়টি তুমি আমার কাছ থেকে শুনেছো। কেননা, আল্লাহর বাণী (মহান পরাক্রমশালী ও মহা সম্মানিত আল্লাহর চেহারাই কেবল অবশিষ্ট থাকবে) এর ব্যাখ্যা আল্লাহর রাজত্ব অবশিষ্ট থাকবে। হে আমার ভাই, এটি কোন মু’মিন মুসলমানের কথা হতে পারে না। আমি এও বলেছি, উক্ত কথাটি যদি থাকে, তবে কিছু নুসখায় রয়েছে। সুতরাং আমার উত্তর পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। জাযাকাল্লাহ, আপনি এখন যে কথাটি উল্লেখ করলেন, তা বিষয়টিকে শক্তিশালী করে যে, হুবহু তা’তীলের পর্যায়ভুক্ত ব্যাখ্যাটি বোখারী শরীফে নেই।

প্রশ্নকর্তা:

হে আমাদের শায়খ, তবে ফাতহুল বারীতে এধরণের একটি কথা রয়েছে। এবং আমার স্মরণ রয়েছে, আমি একবার তাদের দলিলে এটি দেখেছি। সুতরাং এজাতীয় একটি দলিল আমি পেয়েছি। অর্থাৎ কথাটি রযেছে, তবে কিছু নুসখায়। কিন্তু আমি তাকে বলেছি, হয়তো আল্লাহ তায়ালা বিদ্যমান থাকবে এবং তার মাখলুক বিদ্যমান থাকবে, এর বাইরে কিছু নেই। সুতরাং যখন আল্লাহ তায়ালার চেহারা বা তার রাজত্ব ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হবে, তাহলে এখানে কোন জিনিস ধ্বংস হবে?

শায়খ:

উক্ত ব্যাখ্যাটি বাতিল হওয়ার জন্য কোন দলিলের প্রযোজন নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইমাম বোখারী রহ. কর্তৃক উক্ত আয়াতের এ জাতীয় ব্যাখ্যা থেকে তাকে আমরা মুক্ত মনে করবো। তিনি হাদীস শাস্ত্র ও সিফাত সম্পর্কিত বিষয়ের ইমাম। আল-হামদুলিল্লাহ তিনি সালাফী আক্বিদার অনুসারী।

(অনুবাদ শেষ হলো)

উপরে আলবানী সাহেবের সঙ্গে একটি আক্বিদার বিষয়ে একজন প্রশ্নকারীর কিছু কথোপকথন উল্লেখ করা হযেছে। আক্বিদাগত পরিভাষার সাথে যারা পরিচিত নন, তাদের কাছে উক্ত আলোচনার মর্ম অস্পষ্ট থাকতে পারে। এখানে আসলে কী আলোচনা করা হলো অনেকে হয়তো সেটাই ধরতে পারছেন না। আমরা ইনশাআল্রাহ পর্যায়ক্রমে সহজে উক্ত আলোচনাটি উপস্থপানের চেষ্টা করবো।

এখানে খুব সাধারণ কিছু বিষয় বোঝা প্রয়োজন,

১. ইমাম বোখারী এমন কী ব্যাখ্যা করেছেন, যার কারণে তার উপর অভিযোগ করা হলো।

২. উক্ত আয়াতের যে ব্যাখ্যা ইমাম বোখারী করেছেন, সেটা কি আসলেই ভুল এবং এই ব্যাখ্যাটা কি এমন যে, তা কোন মু’মিন মুসলমানের কথা হতে পারে পারে না?

৩. ইমাম বোখারীর ব্যাখ্যাটাকে শায়খ আলবানী হুবহু তা’তীল বলেছেন, এখানে জানার বিষয় হলো, তা’তীল কী, এবং শরীয়তে তা’তীলের বিধান কী?

৪. ইমাম বোখারীর উক্ত ব্যাখ্যাটাকি আসলেই হুবহু তা’তীলের অন্তর্ভূক্ত?

৫. শায়খ আলবানী যে ইমাম বোখারী কর্তুক এধরণের ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছেন, এই সন্দেহের বাস্তবাত কী?

৬. বোখারী শরীফের কিছু নুসখায় থাকার ব্যাপারে আলবানী সাহেবের উক্ত বক্তব্যের কোন ভিত্তি আছে কি?

কিছু মৌলিক কথা:

সালাফীরা তাউহীদকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে থাকে। ইবনে তাইমিয়া রহ. দুইভাগে ভাগ করেছেন, ১. তাউহদীদুর রুবুবিয়া ২. তাউহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত।

পরবর্তী সালাফীরা একে তিন ভাগে ভাগ করে থাকে,

১. তাউহিদুর রুবিবিয়া।

২. তাউহিদুল উলুহিয়া

৩. তাউহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত।

অবশ্য সালাফীদের শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম রহ. তাউহীদকে চার ভাগে ভাগ করেছেন।

১. আল্রাহর অস্তিত্বের উপর ইমাম রাখা।

২. আল্লাহর প্রভূত্বের উপর ইমান রাখা।

৩. আল্লাহর উলুহিয়্যাত তথা আল্লাহর ইবাদতের উপর ইমান রাখা।

৪. আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর উপর ইমান রাখা।

শায়খ সালেহ আল-ফাউযানও  তাউহীদকে এই চার ভাগে বিভক্ত করেছেন।

যদিও তাউহীদকে এভাবে বিভক্ত করার ক্ষেত্রে অনেক বিতর্ক রয়েছে।

যাই হোক, উপরে প্রত্যেকের বিভাজনে একটি বিষয় রয়েছে, সেটি হলো, তাউহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত তথা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর উপর ইমান আনয়ন করা।

এই বিষয়ে মুলত: আশআরী – মাতুরীদি এবঙ হাম্বলী তথা বর্তমানের সালাফীদের সাথে যতো বিরোধ। আমি বিস্তারিত কোন আলোচনায় যাবো না। আল্লাহ তায়ালার সিফাত সম্পর্কিত আয়ায়ত ও হাদীস সম্পর্কে সালাফীদের বক্তব্য হলো, এগুলোর কোন ব্যাখ্যা করা যাবে না। যারা আল্লাহ তায়ালার সিফাত সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসকে ব্যাখ্যা করে তাদেরকে এরা জাহমিয়া ও মুয়াত্তিলা বলে। জাহমিয়া মূলত: জাহাম ইবনে সাফওয়ান (৭৮ হি:-১২৮ হি:) এর অনুসারীদেরকে বলা হতো। কিন্তু হাম্বলী মাযহাবে একাংশ যারা সমগ্র আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন, তারা আশআরী ও মাতুরীদেরকে জাহমিয়া ও মুয়াত্তিলা বলে।

যাই হোক, বর্তমানের তথাকথিত সালাফীদের মূল বিষয় হলো, তারা আল্লাহ তায়ালার সিফাত সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যা কারীকে জাহমিয়া, মুয়াত্তিলা ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করে থাকে। আর এধরণের ব্যাখ্যাকে তারা তাউহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতের পরিপন্থী মনে  করে। তা’তীল শব্দের অর্থ হলো কোন কিছু অস্বীকার বা বাতিল করা। যারা আল্লাহ সিফাত বা গুণ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসকে ব্যাখ্যা বা অস্বীকার করে তাদেরকে এরা মুয়াত্তিলা বলে। আর এই ব্যাখ্যা করাকে তা’তীল মনে করে।

সূরা ক্বাসাসের ৮৮ নং আয়াতে আল্লাহর ওয়াজহ বা চেহারার কথা বলা হয়েছে। এখন ইমাম বোখারী রহ. এই চেহারা শব্দের ব্যাখ্যা আল্লাহর রাজত্ব করেছেন। ইমাম বোখারীর এই ব্যাখ্যাটার কারেণই আলবানী সাহেবের পক্ষ থেকে আপত্তি করা হযেছে। এধরনের ব্যাখ্যা যেহেতু সালাফীদের নিকট তাদের তাউহীদি ধারণার পরিপন্থী অর্থাৎ তাউহীদু আসমা ওয়াস সিফাত  এর পরিপন্থী একারণে আলবানী সাহেব বলেছেন, এই ব্যাখ্যাটা কোন মু’মিন মুসলমানের কথা হতে পারে না। আর এভাবেই, হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম বোখারী রহ. এর উক্ত ব্যাখ্যাকে তাদের দৃষ্টিতে কুফুরী মতবাদ তা’তীলের অন্তর্ভূক্ত মনে করেছেন এবং ইমাম বোখারীর বক্তব্যটাকে বলে মু’মিন মুসলমানের কথা হতে পারে না বলে চরম ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন।

ইমাম বোখারী রহ. এর অবস্থান: সূরা কাসাসের ৮৮ নং আযাতে আল্লাহর চেহারা শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন আল্লাহর রাজত্ব।

আলবানী সাহেব যা করেছেন: ১. ইমাম বোখারী রহ. উক্ত ব্যাখ্যা সম্পর্কে বলেছেন, এটা কোন মু’মিন মুসলমানের কথা হতে পারে না। তাহলে এটা কার কথা? ২. তিনি উক্ত ব্যাখ্যাটাকে কুফূরী মতবাদ তা’তীলের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। ৩.দিবালোকের ন্যায় স্পষ্টভাবে  বোখারী শরীফে বিষয়টি থাকা সত্বেও কিছু নুসখায় আছে বলে একটা মারাত্মক ভুল দাবী করেছেন।

আলবানী সাহেবের কথা অনুযায়ী উক্ত ব্যাখ্যাটি তা’তীল এবং কোন মু’মিন মুসলমানের কথা নয়। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যার ব্যাপারে আলবানী সাহেব এর কথা তার কোন ভক্ত অস্বীকার করতে পারবেন না। এখন, বিষয়টি যদি বোখারীতে থাকে, তাহলে ইমাম বোখারী আলবানীর আক্রমণের অন্তর্ভূক্ত হবেন, আর যদি না থাকে তাহলে তিনি এর থেকে মুক্ত থাকবেন। একই ভাবে আলবানীর এই তাকফিরি বক্তব্য তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে যারা উক্ত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় পর্বে এই বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করা হবে ইনশাআল্লাহ।দুরুসুন লিশ শায়খিল আলবানী, শামেলা।দুরুসুন লিশ শায়খিল আলবানী, শামেলা।

পূর্বের পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, শায়খ আলবানী ইমাম বোখারী রহ. এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে বলেছেন, এটি কোন মু’মিন মুসলমানের  কথা নয এবং এটি তা’তীলের অন্তর্ভূ্ক্ত। আসুন, প্রথমে আমরা জেনে নেই, তা’তীল বা মুয়াত্তিলাদের সম্পর্কে সালাফীরেদ বক্তব্য কি। আলোচান দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কায় কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করবো।

উদাহরণ: (১)

সালাফীদের বিভিন্ন শায়খদের সমন্বয়ে লিখিত ১৬ খন্ডে প্রকাশিত আদ-দুরারুস সুন্নিয়া ফিল আজইবাতনুন নজদিয়া নামক কিতাবে রয়েছে,

فإن تعطيل الصفات، عما دلت عليه كفر، والتشبيه فيها كذلك كفر

অর্থাৎ কোন সিফাতকে বাতিল তথা তা’তীল করা কুফূরী এবঙ একইভাবে কোন সিফাতকে তাশবীহ বা সাদৃশ্য দেয়াও কুফুরী।

সূত্র: আদ-দুরারুস সুন্নিয়া ফিল আজইবাতনুন নজদিয়, খ.২, পৃ.৩১, তাহকীক: আব্দুর রহামন বিন মুহাম্মাদ বিন ক্বাসেম। ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৯৯৬

নিচের স্ক্রিনশটটি লক্ষ্য করুন,

সালাফীরা মুয়াত্তিলাদের পাশাপাশি জাহমিয়াদেরকেও কাফের বলে থাকে। উল্লেখ্য, বর্তমানে তারা জাহমিয়া দ্বারা আশআরী ও মাতুরীদেরকে উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে। বিখ্যাত ইমাম ও মুফাসসির তাফসীরে কাবীরের গ্রন্থকার আল্লামা ফখরুদ্দিন রাযী রহ. এর বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়া রহ. বেশ কয়েকটি কিতাব লিখেছেন। এগুলোর মূল কারণ হলো, ফখরুদ্দিন রাযী রহ. আশআরী আক্বিদার অনুসারী ছিছেন। বিশেষভাবে ইবনে তাইমিয়ার বয়ানু তালবিসিল জাহমিয়া বইটি আশআরী ও মাতুরীদেরে বিরুদ্ধে লেখা। এই বইয়ে তিনি জাহমিয়া দ্বারা এদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন এবং সম্পূর্ণ বইয়ে এই দুই আক্বিদার অনুসারীদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। বর্তমানে এটি 10 খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এই কিতাবে মূল নাম হলো, নকজু আসাসিত তাকদীস। ফখরুদ্দিন রাযী রহ. এর বিখ্যাত কিতাব আসাসুত তাকদীস এর বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়া রহ. এই কিতাবটি লেখেন। এই বিষয়ে মতানৈক্যৈর কারণে ফখরুদ্দিন রাযীকে বিভিন্ন গর্হিত বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। যার অনেকগুলো তাকফিরি শব্দ। অথচ এই ধরণের আচরণ কখনই শরীয়ত সমর্থিত নয়।

উদাহরণ(২): সম্প্রতি দারুল আসিমা থেকে প্রকাশিত ইজমাউ আহলিস সুন্নাতিন নববিয়্যাতি আলা তাকফিরিল মুয়াত্তিলাতিল জাহমিয়্যাতি। এটি মূলত: সউদীর বিখ্যাত তিন শায়খের রচনার সঙ্কলন। ১.ইবরাহিম ইবনে আব্দুল লতিফ ২. শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল লতিফ। ৩. শায়খ সুলাইমান বিন সাহমান।

এই তিন শায়খ মুয়াত্তিলা ও জাহমিয়াদের কাফের হওয়ার ব্যাপারে আহলে সু্ন্নাত ওযাল জামাতের ইজমা বা ঐকমত্যের দাবী করেছেন। তারা তাদের কিতাবে জাহমিয়া ও মুয়াত্তিলাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের তাকফিরি শব্দ উল্লেখ করেছেন।

উদাহরণ (৩): যারা আল্লাহর সিফাত সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যা করে তাদের সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়াও অনেক তাকফিরি শব্দ ব্যবহার করেছেন। বিশেষভাবে মুয়াত্তিলা ও জাহমিয়াদের বিরুদ্ধে। ইবনে তাইমিয়া রহ. মাজমুউল ফাতাওয়া-তে মুয়ত্তিলা ও জাহমিয়াদের সম্পর্কে কুফূরীর কথা উল্লেখ করেছেন। লক্ষ্য করুন,

উপরের সামান্য আলোচনা থেকে পাঠকের নিকট স্পষ্ট হয়েছে যে, সালাফিদের নিকট তা’তীল কতো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। অনেকেই তা’তীল ও মুয়াত্তিলাদের সম্পর্কে না জেনে বিষয়টিকে খুবই সহজ ও স্বাভাবিক মনে করেছেন। শায়খ আলবানী যখন ইমাম বোখারী রহ. এর উক্ত বক্তব্যকে হুবহু তা’তীল বলে উল্লেখ করলেন, তখন এটি কতো মারাত্মক কথা তা উপরের কয়েকটি থেকে আশা করি বুঝতে পেরেছেন।

আমি দ্বিতীয় পর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আলোচনা দীর্ঘ হওয়াই তৃতীয় পর্বে ইনশাআল্লাহ উল্লেখ করা হবে।আদ-দুরারুস সুন্নিয়াআদ-দুরারুস সুন্নিয়া

পূর্বের দু’টি পর্বে শায়খ আলবানীর কথোপকথন এবং ইমাম বোখারী রহ.এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে তার বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে।  শায়খ আলবানী তার বক্তব্যে যেই বিষয়টির উপর জোর দিয়েছেন, ইমাম বোখারী রহ. এর মতো এতো বড় মুহাদ্দিস সূরা ক্বাসাসের ৮৮ নং আয়াতের এমন ব্যাখ্যা করতে পারেন না। আর যদি বোখারী উক্ত বক্তব্যটি থাকেও, তবে কিছু নুসখায় রয়েছে। উক্ত ব্যাখ্যার সাথে আলবানী সাহেব এর এমন কি শত্রুতা রযেছে, যার কারণে তিনি একে বললেন, কোন মু’মিন মুসলমানের কথা নয় এবং এটি তা’তীলের অন্তর্ভূক্ত? তিনি আলোচনার শেষে বলেছেন, ইমাম বোখারী রহ. কর্তৃক এধরনের ব্যাখ্যা থেকে আমরা তাকে মুক্ত মনে করবো। এর দ্বারা স্পষ্ট যে, উক্ত ব্যাখ্যাটি আলবানী সাহেবের নিকট কতো মারাত্মক। বিষয়টি তার নিকট এতটাই গুরুতর যে, তিনি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্টভাবে উক্ত বক্তব্যটি বোখারী শরীফে থাকা সত্ত্বেও বললেন, এটি বোখারীতে যদি থাকে, তবে কিছু নুসখায় রয়েছে। উক্ত কথাটি বোখারী শরীফে আছে কি না, এই আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে উক্ত ব্যাখ্যাটি ইমাম বোখারী ছাড়া আর কে কে উল্লেখ করেছেন, তা আলোচনা করবো।

ইমাম বোখারী রহ. এর ব্যাখ্যাটি হলো, বোখারী শরীফে সুরা ক্বাসাসের ৮৮ নং আয়াত كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ (আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে) এর ব্যাখ্যায় ইমাম বোখারী রহ. আল্লাহর চেহারা এর ব্যাখ্যা করেছেন আল্লাহ রাজত্ব (অর্থাৎ আল্লাহর রাজত্ব ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে)।

লক্ষ্য করুন,

ইসলামিক ফাউন্ডেশন কৃত বোখারী শরীফ, অষ্টম খণ্ড, পৃ.১৩০। তাফসীর অধ্যায়। সূরা ক্বাসাস এর তাফসীর।

উক্ত তাফসীরটি বোখারী শরীফে আছে কি না, সেটা আলোচনার পূর্বে সূরা ক্বাসাসের ৮৮ নং আয়াতের তাফসীর যারা হুবহু ইমাম বোখারীর মতো উল্লেখ করেছেন, তাদের নাম উল্লেখ করবো। নিম্বে যাদের কথা উল্লেখ করা হবে, তাদের প্রত্যেকেই ক্ষেত্রেই কি একথা বলা সম্ভব যে, এ্টি কোন মু’মিন মুসলমানের কথা নয় এবং এটি কুফূরী মতবাদ তা’তীলের অন্তর্ভূক্ত?

ইমাম বোখারী ব্যতীত অন্য যারা একই ব্যাখ্যা করেছেন:

১. ইবনে তাইমিয়া রহ. তার বয়ানু তালবিবিসিল জাহমিয়া নামক কিতাবে ইমাম ইবনে কাইসান থেকে উক্ত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন। দেখুন, বয়ানু তালবিসিল জাহমিয়া, খ.১ পৃ.৫৮১

 আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. ইমাম বোখারীর উক্ত ব্যাখ্যাটি হুবহু ইমাম ইবনে কাইসান থেকে বর্নণা করেছেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. মাজমুউল ফাতাওয়া এর দ্বিতীয় খন্ডে এ্টি উল্লেখ করেছেন। নিচের স্ক্রিনশটটি লক্ষ্য করুন,

২. ইবনুল কাইয়্যিম রহ: ইবনুল কাইয়্যিম রহ. (৬৯১-৭৫১ হি:) তার হাদীল আরওয়াহ নামক বইয়ে ইমাম বোখারীর উক্ত বক্তব্যটি হুবহু উল্লেখ করেছেন,

৩. ইমাম মাওয়ারদী রহ. (৩৬৪-৪৫০ হি:)  তার বিখ্যাত তাফসীর আন নুকাতু ওয়াল উয়ূন তথা তাফসীরে মাওয়ারদীতে ইমাম বোখারী রহ. উক্ত ব্যাখ্যাটি হুবহু উল্লেখ করেছেন। স্কিনশটটি দেখুন,

৪. ইমাম আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. (মতৃ: ৩৭৫ হি:)  তার তাফসীরে সমরকন্দী যেটি বাহরুল উলুম নামে প্রসিদ্ধ, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় চেহারা এর ব্যাখ্যা লিখেছেন, আল্লাহর রাজত্ব।

৫. ইমাম বাগাবী রহ. (মৃত: ৫১৬ হি:) তার তাফসীরে বাগাবীতে একই ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন,

৬. ইমাম সা’লাবী রহ. (মৃত:৪২৭ হি:) তার বিখ্যাত তাফসীরে সা’লাবী-তে উক্ত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন,

সালাফী শায়খদের মাঝে যারা উক্ত ব্যাখ্যাটি তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন:

৭. সাইদ বিন নাসের আল-গামিদী আর রদ্দুল আলা মুনকিরি সিফাতাইল ওয়াজহি ওয়াল ইয়াদ কিতাবে উক্ত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন। দেখুন,

৮. সালাফী শায়খ উমর সুলাইমান আল-আশকার তার আল-জান্নাতু ওয়ান নার বইয়ে উক্ত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন।

৯. সালাফীদের বিখ্যাত শায়খ আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আল-গুনাইমান  তার শরহু কিতাবিত তাউহীদ মিন সহিহিল বোখারী নামক কিতাবে উক্ত ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন,

আলবানী সাহেবের যেসমস্ত ভক্তরা উক্ত বক্তব্যের ব্যাপারে বিভিন্নি অভিযোগ করেছেন, তাদের কোন অভিযোগ থাকলে কমেন্ট করবেন। চতুর্থ পর্বে ইনশাআল্লাহ বোখারীতে উক্ত বক্তব্যটি আছে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা করবো।মাজমুউল ফাতাওয়া, খন্ড-২, পৃ.৪২৮

মাজমুউল ফাতাওয়া, খন্ড-২, পৃ.৪২৮

হাদীল আরওয়াহ কভার পেজ।হাদীল

আরওয়াহ কভার পেজ।হাদীল আরওয়াহ, খ.১, পৃ.৯৬হাদীল আরওয়াহ, খ.১, পৃ.৯৬তাফসীরে মাওয়ারদী, পৃ.২৭৩তাফসীরে মাওয়ারদী, পৃ.২৭৩তাফসীরে বাগাবী, খন্ড-৬, পৃ.২২৮তাফসীরে বাগাবী, খন্ড-৬, পৃ.২২৮তাফসীরে সা'লবী, খ.৭, পৃ.২৬৮তাফসীরে সা’লবী, খ.৭, পৃ.২৬৮আর রদ্দু আলা মুনকিরি সিফাতাইল ওয়াজহি ওয়াল ইয়াদ, পৃ.৭০

আর রদ্দু আলা মুনকিরি সিফাতাইল ওয়াজহি ওয়াল ইয়াদ, পৃ.৭০আল-জান্নাতু ওয়ান নারা, পৃ.১৭০আল-জান্নাতু ওয়ান নারা, পৃ.১৭০

কিছু মেৌলিক কথা:

ইমাম বোখারী থেকে যারা বোখারী শরীফ বর্ণনা করেছেন:

 ইমাম বোখারী থেকে অনেকেই বোখারী শরীফ বর্ণনা করেছেন। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো।

১. আবু আব্দুল্লাহ ইউসুফ ইবনে মাতার ইবনে সালেহ বিন বাশার আল-ফারাবরী রহ:

তিনি ইমাম ফারাবরী নামে প্রসিদ্ধ। ইমাম ফারাবরী থেকে মোট সাতজন বোখারী শরীফ বর্ণনা করেছেন।

২. ইমাম বোখারী রহ. থেকে সরাসরি বোখারী শরীফ বর্ণনা করেছেন আবু ইসহাক ইব্রাহীম ইবনে মা’কিল আন-নাসাফী রহ. (মৃত: ২৯৫ হি:)

আমাদের আলোচনায ইমাম নাসাফী রহ. এর রেওযাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটা নিয়েই আমাদের মূল আলোচনা।

৩. ইমাম বোখারী রহ. থেকে সরাসরি রেওয়াত করেছেন, হাম্মাদ বিন শাকের আন-নাসাফী (মৃত: ৩১১)

৪. আবু ত্বলহা মুহাম্মাদ ইবনে মানসুর আল-বাযদাবী আন নাসাফী (মৃত: ৩১৯ হি:)।

অর্থাৎ ইমাম বোখারী রহ. থেকে বোখারী শরীফ বর্ণনা করেছেন, এমন তিন জন মুহাদ্দিস নাসাফী নামে প্রসিদ্ধ।

৫. ইমাম বোখারী রহ. থেকে সরাসরি বর্ণনা করেছেন কাযী আবু আব্দুল্লাহ হুসাইন ইবনে ইসমাইল আল-মাহামেলী রহ. (মৃত:৩৩০ হি:)

এবার বোখারী শরীফের নুসখা সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করবো।

বোখারী শরীফের নুসখা সমূহ:

বোখারী শরীফের মোট উনিশটি নুসখা রয়েছে। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. ফয়যুল বারীতে এ সংক্রান্ত আলোচনা করেছেন। এই নুসখারগুলোর মাঝে সামান্য যে পার্থক্য রয়েছে, পরবর্তী নুসখাগুলো এই বিষয়গুলো সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ একটা নুসখাকে মুল সাব্যস্ত করে অন্যান্য নুসখার তারতম্যগুলোর প্রতি টীকায় ইঙ্গিত করা হযেছে। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. প্রায় সকল নুসখার পার্থক্য সম্পর্কে ফাতহুল বারীতে আলোচনা করেছেন।

বোখারী শরীফের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নুসখা হলো, আল্লামা শরফুদ্দিন ইউনিনি রহ. (৭০১ হি:) এর নুসখা। এখানে অন্যান্য নুসখার পার্থক্যগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য নুসখার পার্থক্য বোঝানোর জন্য যে এখানে যে অক্ষরগুলো ব্যবহৃত হয়েছে নিচে উল্লেখ করা হলো,

১. হা (ه), ইমাম আবু যর হারাবী রহ.এর নুসখা বোঝানোর জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

২.সোয়াদ (ص)ইমাম আসিলি রহ. এর নুসখা বোঝানোর জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

৩. সিন (س)অথবা শিন (ش) এটি ইবনে আসাকির রহ. এর নুসখা বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছিলো।

৪. ত্ব (ط)অথবা জ (ظ)ইমাম আবু ওয়াক্ত রহ.এর নুসখার জন্য।

৫. লম্বা হা (هه) ইমাম কুশমিহিনি রহ. এর নুসখার জন্য।

৬. হা,(ح) ইমাম হামাবী রহ. এর নুসখার জন্য।

৭. লম্বা সিন, (س) ইমাম মুসতামালি রহ. এর নুসখার জন্য।

৮. কাফ, (ك) কারীমা রহ. এর নুসখার জন্য।

৯. আইন, (ع) ইবনুস সামআনী রহ. এর নুসখার জন্য।

১০. জিম, (ج) আাল্লামা জুরজানী রহ.এর নুসখার জন্য।

নিচের স্ত্রিনশটটি দেখুন, ১৩১২ হি: তে বুলাক থেকে প্রকাশিত শরফুদ্দিন ইউনিনি রহ. এর নুসখার স্ক্রিনশট,

উপরের বিষয়গুলো বুঝলে ইমাম বোখারী রহ.এর বক্তব্যটি বোখারীতে আছে কি না বুঝতে সহজ হবে।

প্রথম কথা হলো, ইমাম বোখারী রহ. উক্ত বক্তব্যটি সুর্যের মতো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এ বক্তব্যের ব্যাপারে কোন নুসখাতে কোন বিরোধ নেই। সকল নুসখাতে এটি রয়েছে। এবং এ পর্যন্ত কেউ এই বিরোধের কথা বলেননি। আর ভবিষ্যতেও আলবানী সাহেবের অন্ধ ভক্তরা ছাড়া আর কেউ বলবে না। কারণটি বিশ্লেষণ করছি।

আলবানী সাহেবের মূল দাবী ছিলো, আল্লাহর রাজত্ব ব্যতীত সকল কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, এটা বোখারী শরীফে নেই। আর থাকলেও কিছু নুসখায় আছে।

আলবানী সাহেব কিভাবে একটি ধ্রুব সত্যকে এভাবে সন্দেহের আবরণে ঢাকতে চাইলেন, তা আমাদের অজানা। তিন শ এর বেশি রাবীর জীবনী সম্পর্কে বলেছেন, তাদের জীবনী নেই কিংবা আমি পাইনি, অথচ হুবহু যে কিতাব তিনি দেখেছেন সেটাতেই উক্ত রাবীর জীবনী রয়েছে। এভাবে তাহকীক না করে কথা বললে আাস্তে আস্তে মানুষ বোখারী শরীফের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। তিনি ইচ্ছায় হোক, কিংব অনিচ্ছায়, এতো বড় একটা কথা বলার আগে একটু তাহকীকের প্রয়োজন ছিলো।

আলবানী সাহেবের পূর্বে বোখারী শরীফ থেকে যারা উক্ত বিষয়টি তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন,

১. ইবনুল কাইয়্যিম রহ. (৭৫১ হি:)  তিনি তার হাদীল আরওয়াহ ( খ. ১, পৃ. ৯৬) কিতাবে বোখারী শরীফ থেকে এটি উল্লেখ করেছেন।

২.ইমাম মাওয়ারদী রহ. (৩৬৪-৪৫০ হি:)  তার বিখ্যাত তাফসীর আন নুকাতু ওয়াল উয়ূন তথা তাফসীরে মাওয়ারদীতে ইমাম বোখারী রহ. উক্ত ব্যাখ্যাটি ইমাম বোখারীর সূত্রে উল্লেখ করেছেন।

৩. ইবনে কাসীর রহ. (৭০০-৭৭৪ হি:)  তার তাফসীরে ইবনে কাসীরে এটি উল্লেখ করেছেন। খন্ড.৬, পৃ,২৬২। অবশ্য ইবনে কাসীর রহ. ইমাম বোখারীর রেফারেন্সে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, وقال مجاهد والثوري في قوله: { كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلا وَجْهَهُ } أي: إلا ما أريد به وجهه، وحكاه البخاري في صحيحه كالمقرر له

অর্থাৎ  ইমাম মুজাহিদ রহ. ও সুফিয়ান রহ. আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, এই আয়াতের তাফসীরে বলেছন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা কিছু করা হয়েছে, তা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। ইমাম বোখারী রহ. উক্ত তাফসীরটি গ্রহণ করে বোখারী শরীফে ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন।

৪. উমদাতুল কারীতে আল্লাম বদরুদ্দিন আইনী রহ. উক্ত ব্যাখ্যটি উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি নুসখার ভিন্নতার কোন কথা বলেননি।

৫. আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে উক্ত কথাটি উল্লেখ করেছেন এবং এ ব্যাপারে নুসখার কোন ভিন্নতার কতা বলেননি।

 ৬. বর্তমানে সবাইকে ইমাম শরফুদ্দিন ইউনিনি রহ. এর নুসখার উপর ভি্ত্তি করে চলতে হয়। শরফূদ্দিন ইউনিনি রহ. এর নুসখাটি ইমাম ক্বাসতাল্লানী রহ. (৮২১-৯২৩ হি:) বর্ণনা করেছেন। সুতরাং ক্বাসতাল্লানী রহ. এর এই নুসখার গুরুত্ব অপরিসীম। যেমনটি আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. ফয়যুল বারীতে উল্লেখ করেছেন । দেখুন, ফয়যুল বারী, খ.১ পৃ. ৩৭-৩৮। ইমাম ক্বাসতাল্লানী রহ. বোখারী শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইরশাদুস সারী এর মতন হিসেবে উক্ত ব্যখ্যাটি উল্লেখ করেছেন। দেখুন,

7. আল্লামা হাবেদ সিন্ধী রহ.বোখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন। কিতাবের নাম, হাশিয়াতুস সিন্দী আলা সহিহিল বোখারী। তিনি ইমাম বোখারী রহ. উক্ত ব্যাখ্যাটির বিশ্লেষণ করেছেন।

এভাবে আলবানী সাহেবের পূর্বে কেউ উক্ত ব্যাখ্যার ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করেননি।

বোখারী শরীফের গ্রহণযোগ্য প্রকাশনা ও সংস্করণ:

সারা পৃথিবীতে বোখারী শরীফের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও বিশুদ্ধ প্রকাশনী হলো,

১. আব্দুস সালাম বিন মুহাম্মাদ উমর এর তাহকীকে মাকতাবাতুর  রুশদ এর প্রকাশিত বোখারী শরীফ।

২. দারু ইবনে কাসীর থেকে প্রকাশিত বোখারী শরীফ। বয়রুত।

৩. মুহিব্বুদ্দিন আল-খতীব ও মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী এর তাহকীকে মাকতাবাতুস সালাফিয়্যা থেকে প্রকাশিত বোখারী শরীফ।

৪. জমইয়াতুল মাকনাজ থেকে প্রকাশিত বোখারী শরীফ।

৫. মুহাম্মাদ যুহাইর বিন নাসের আন-নাসের এর তাহকীকে দারু ত্বওকিন নাজাহ থেকে প্রকাশিত বোখারী শরীফ।

এই সবগুলো প্রকাশনা বিশুদ্ধ এবং তাহকীক করা। মোট কথা, বোখারী শরীফের সকল নুসখা, প্রকাশনা ও সংস্করণে উক্ত কথাটি রয়েছে এবং ইতোপূর্বে কেউ এব্যাপারে সামান্যতম কোন সংশয় প্রকাশ করেননি। এটি এমন একটি ধ্রুব সত্য যে, কারও পক্ষে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

নিচে বোখারী শরীফের এই বিশুদ্ধ প্রকাশনাগুলোর স্ত্রিনশট দিচ্ছি। পাঠক, নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করুন।

১. মুহাম্মাদ বিন যুহাইর বিন নাসের আন নাসের এর তাহকীকে শরফুদ্দিন ইউনিনি রহ. এর নুসখাটি প্রকাশিত হয়েছে এবং এখানে উপর্যুক্ত চিহৃগুলোর মাধ্যমে নুসখার পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে। এই উক্ত নুসখাটিতে ইমাম বোখারী রহ. এই বক্তব্যের ব্যাপারে নুসখার কোন পার্থক্যে কথা নেই। দেখুন,

২. মাকতাবাতুর রুশদ থেকে প্রকাশিত আব্দুস সালাম বিন মুহাম্মাদ উমর এর তাহকীকে যে বোখারী শরীফ প্রকাশিত হয়েছে, এটি মূলত: শরফুদ্দিন ইউনিনি রহ. এর নুসখার উপর ভিত্তি করে এবং অন্যান্য সঙ্গে তুলনা করে একে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রকাশ কর হয়েছে। কভার পেজে লেখা রয়েছে,

طبعة معتمدة علي النسخة السلطانيه  المعتمدة علي النسخة اليونينية و مصححة علي عدة نسخ

অর্থাৎ এই সংস্করণটি সুলতানিয়া নুসখার উপর ভিত্তি করে প্রকাশ করা হয়েছে। সুলতানিয়া নুসখার মূল ভিত্তি হলো, ইউনিনি নুসখা। এবং বিভিন্ন নুসখার আলোকে একে বিশুদ্ধ করা হয়েছে। দেখুন,

ইমাম বোখারীর উক্ত কথাটি এখানেও রয়েছে। দেুখুন,

৩. দারু ইবনে কাসীর দামেশক থেকে প্রকাশিত বোখারী শরীফের কভার পেজে লেখা রয়েছে,

طبعة جديدة مضبوطة مصححة

অর্থাৎ একটি নতুন, বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য সংস্করণ। লক্ষ্য করুন,

দারু ইবনে কাসীরের এই প্রকাশনাতেও উক্ত কথাটি রয়েছে,

৪. মুহিব্বুদ্দিন আল খতীব এর তাহকীকে সহীহ বোখারী প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেও ইমাম বোখারীর উক্ত বক্তব্যটি রয়েছে।

সংক্ষিপ্ত কথা হলো বোখারী শরীফের সকল নুসখা ও সংস্করণে উক্ত কথাটি রয়েছে। নুসখার ভিন্নতার দাবী মনগড়া, তাহকীকবিহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অমূলক বৈ কিছুই নয়।

আলবানী সাহেবের তাহকীকের প্রকৃত অবস্থা নামে একটা নোট লিখেছি। এটা পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন, আলবানী সাহেব অসতর্ক অবস্থায় অনেক কথা ও তথ্য দিয়েছেন, যা আসলেই ভুল। পরবর্তীতে হয়তো তিনি নিজেই তার বিরোধীতা করে স্ববিরোধীতায় লিপ্ত হয়েছেন। তিনি অসংখ্য রাবীর জীবনী সম্পর্কে বলেছেন,  তার জীবনী আমি পাইনি কিন্তু তিনি যে কিতাবের কথা বলেছেন, হুবহু সেই কিতাবেই উক্ত রাবীর জীবনী বিদ্যমান রয়েছে।

আলবানী সাহেব যে বলেছেন, ইমাম বোখারীর উক্ত কথাটি কিছু নুসখায় রয়েছে, তার এই কথার মূল ভিত্তি কী?

আলবানী সাহেব এর বক্তব্যের ভিত্তি:

এখানে আলবানী সাহেবের ব্যাপারটি আমাদের দেশে প্রচলিত একটি কথার মতো হয়েছে, অর্থাৎ এখানে প্রস্রাব করিবেন, না করিলে ৫০ টাকা জরিমানা। ফাতহুল বারী তে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. যেই শব্দটির ভিন্নতার কথা আলোচনা করেছেন, সেটি হলো, وقال معمر

অর্থাৎ এই শব্দটি বোখারী শরীফের ইমাম ফারাবরী রহ. এর নুসখাতে রয়েছে। এটি কোন অসম্ভব কিছু নয়। ইমাম বোখারী উক্ত তাফসীরটি ইমাম মা’মার এর সূত্রে বর্ণনার কথা শুধু ফারাবরী রহ. এর নুসখায় থাকায় এ ব্যাপারে ইবনে হাজারী আসকালানী রহ. নুসখার ভিন্নতার কথা বলেছেন। উক্ত ব্যাখ্যার ভিন্নতার কথা বলা হয়নি। পরের বক্তব্যকে পূর্বের সাথে মিলিয়ে আলবানী সাহেব এই বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন যে, এই ব্যাখ্যার ব্যাপারে নুসখার ভিন্নতার কথা বলা হয়েছে। এটি একটি দিবালোকের ন্যায় সত্য বিষয় যে, ইবনে হাজার আসকালানী রহ. সহ পূর্বের কেউ উক্ত ব্যাখ্যাটির ব্যাপারে নুসখার ভিন্নতার দাবী করেননি। এবং বোখারীতে নেই, এই জাতীয় কথা বলেননি। নিজের মতের বিরোধী হওয়ার কারণে কেবল আলবানী সাহেব না এটি বলেছেন।

উপরের স্ক্রিনশটে লক্ষ্য করলে দেখবেন, ব্র্যাকেটের বক্তব্য হলো, ইমাম বোখারী রহ. এর এবং এর বাইরের বক্তব্য ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর ব্যাখ্যা।

এখানে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেছেন, [ইমাম বোখারী থেকে নাসাফী রহ. এর বর্ণনায় রয়েছে, وقال معمر (ইমাম মা’মার বলেছেন), অত:পর, ইমাম বোখারী রহ. উক্ত বক্তব্যটি উল্লেখ করেছেন। (অর্থাৎ নাসাফীর বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহর রাজত্ব ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, এটি ইমাম মা’মার এর বক্তব্য এবং তার উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম বোখারী এটা বর্ণনা করেছেন)। এখানে ইমাম মা’মার হলেন, আবু উবাইদা ইবনুল মুসান্না। ইমাম মা’মার  তার মাজাযুল কুরআনে এ সম্পর্কে লিখেছেন, তবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহ ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। ] (ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর বক্তব্য শেষ হলো)।

অর্থাৎ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর এই আলোচনার মূল হলো, আল্লাহর রাজত্ব ব্যতী সব ধ্বংস হয়ে যাবে, এই ব্যাখ্যাটি ইমাম বোখারী থেকে যারা বোখারী শরীফ বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে ইমাম নাসাফী রহ. একটি শব্দ বেশি বলেছেন। সেটি হলো,  وقال معمر

অন্যদের বর্ণনায় এই শব্দটি নেই। অর্থাৎ অন্যদের বর্ণনায় উক্ত বক্তব্যটি সরাসরি ইমাম বোখারী থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইমাম নাসাফী রহ. এর বর্ণনায় রয়েছে, ইমাম বোখারী রহ. উক্ত বক্তব্যটি ইমাম মা’মার থেকে গ্রহণ করেছেন এবং তার সূত্রে বণনা করেছেন। এখানে মেৌলিক কথা হলো, ইমাম বোখারী রহ. কিতাবুত তাফসীরে কখনও নিজের তাফসীর বর্ণনা করেছেন, কখনও অন্যের সূত্রে তাফসীর বর্ণনা করেছেন। এখানে যে তাফসীরটি উল্লেখ করা হযেছে, ইমাম বোখারী রহ. থেকে যারা বর্ণনা করেছেন, তাদের সকলেই সরাসির ইমাম বোখারীর উক্তি হিসেবে উল্রেখ করেছেন। ইমাম নাসাফী রহ. একে বোখারী  থেকে ইমাম মা’মারের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ইমাম বোখারী রহ. বলেছেন, ইমাম মা’মার উক্ত ব্যাখ্যা করেছেন।

এটি সরাসরি ইমাম বোখারী রহ. এর বক্তব্য হওযাটাই অধিক শক্তিশালী। কারণ, ইমাম মা’মার রহ. এর মাজাযুল কুরআনে উক্ত ব্যাখ্যাটি নেই। তবে এটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কেননা, এটি ইমাম বোখারী রহ. এর নিকট অন্য সূত্রে ইমাম মা’মার রহ. উক্ত ব্যাখ্যাটি পেৌছতে পারে। এটি কোন সমস্যা নয়। এটি ইমাম বোখারীর নিজের বক্তব্য হোক, কিংবা তিনি ইমাম মা’মার থেকে বর্ণনা করুক, উভয়টি প্রমাণ করে যে বোখারী শরীফে উক্ত ব্যাখ্যাটি ইমাম বোখারী দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবঙ উক্ত ব্যাখ্যাটি তার নিকট বিশুদ্ধ।

আমি সকল আলবানী ভক্তদের উদাত্ত আহ্বান জানাবো তারা ফাতহুল বারী কিংবা যে কোন একটা নোসখা থেকে প্রমাণ করুন, যে উক্ত বক্তব্যটি বোখারী শরীফে নেই।  এভাবে নিজেরা অন্ধ অনুসরণ করে অন্যদেরকে অন্ধ বলার মানসিকতা ত্যাগ করুন। আপনাদের মাঝে অনেক আরবী জানা লোক আছে, প্রযোজনে তাদের সাহায্য নিন এবঙ ফাতহুল বারীতে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. যা বলেছেন, সেটি কি আলবানী সাহেবের বক্তব্যকে আদেৌ সমর্থন করে কি না প্রমাণ করুন।  এ ব্যাপারে এটিই আমার সর্বশেষ পোস্ট। সুতরাং যারা আলবানী সাহেবের ভুলের উপর ভুলের পাহাড় বানাতে আগ্রহী, তারা অন্ধভাবে আলবানী সাহেবের কথা মেনে নিন। আর যদি নিজেদেরকে সত্য অনুসন্ধানী দাবী করে থাকেন, তবে আপনাদের আলেমদের সহযোগিতা নিয়ে আলবানী সাহেবের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করবেন বলে আশা রাখি।وقال مجاهد والثوري في قوله: { كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلا وَجْهَهُ } أي: إلا ما أريد به وجهه، وحكاه البخاري في صحيحه كالمقرر له

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 685
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83