ইলম

বেদয়াতের কবলে নবীজীর নামায (পর্ব-২)

ইজহারুল ইসলাম শুক্র, 10 সেপ্টে., 2021
27

নামাযে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রাখা


সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ফতোয়া বোর্ডের সম্মানিত সদস্য ও মুফতী ড.বকর আবু যায়েদ লা জাদিদা ফি আহকামিস সালাহ (নামাযের বিধি-বিধানে কোন নতুনত্ব নেই) নামে একটি কিতাব লিখেছেন। এই কিতাবে তিনি নামাযের বিধি-বিধানে বর্তমান সময়ে সৃষ্ট কিছু বিদয়াত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কিছু বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যজ্য মতামতকে সুন্নত হিসেবে চালিয়ে দেয়ার হীন প্রচেষ্টার কঠোর সমালোচনা করেছেন।

ড.বকর আবু যায়েদ তার এই কিতাবের ভূমিকায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। আমরা তার বক্তব্যের চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরছি।

১. ড.বকর আবু যায়েদ লিখেছেন,

“ বর্তমান সময়ে  কিছু লোক বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত বক্তব্যের প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছে। তারা এগুলো প্রচার করে, এর দ্বারা দলিল প্রদান করে থাকে। এসব বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত বক্তব্যের দিকে মানুষকে উৎসাহের সঙ্গে দাওয়াত দেয়। অথবা তারা এমন কিছু জন বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত সরল মাসআলা (রুখসত) অবলম্বন করে, যেগুলো শরীয়তে নিন্দনীয়। অথচ তারা এগুলোকে প্রসিদ্ধ বানানোর চেষ্টা করে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিষয়গুলোকে ব্যাপক ও পরিচিত বানানোর পিছে সীমাহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে”। সালাফে সালেহীন ও পূর্ববর্তী আলেমগণ এসব বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত বক্তব্য গ্রহণকারী সম্পর্কে যেসব সতর্কবাণী উল্লেখ করেছেন, এবং তাদেরকে যে পরিমাণ ভৎসনা করেছেন, আমাদের জন্য তাদের এসব বক্তব্যই যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমানে শরীয়তের ওয়াজিব ও মুস্তাহাব নির্ধারণে নতুন নতুন মতবাদের আবির্ভাব হয়েছে। প্রকাশ্য ইবাদতসমূহ ও শরীয়তের বড় বড় বিধি-বিধানে এমনসব নতুন নতুন বক্তব্যের অবতারণা করা হয়েছে  ইসলামের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যেগুলোর কোন অস্তিত্ব ছিলো না। এগুলোর সাথে উলামায়ে কেরাম পরিচিতিও ছিলেন না। গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এসব মাসআলা যুগ যুগ ধরে পরিত্যক্ত হয়ে আসছে। এসব মাসআলা ভ্রান্ত হওয়ার জন্য এটুকু যথেষ্ট যে, “এসব বক্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্যের বিপরীত”।কালেমার পরে ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত রুকন ‘নামাযের’ মাঝে এমন কিছু আমল, পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন উদ্ভাবিত হয়েছে যেগুলো পালনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় মুসল্লী অস্বাভাবিক কৃত্রিমতা  ও বাস্তবতা বিরোধী কাজের সম্মুখীন হয়। অথচ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “ আমি আপনাকে অস্বাভাবিক কষ্টের মুখোমুখি করবো না”।

রাসূল স. বলেন, “ আমাকে একটি উন্নত ও স্বভাবজাত ধর্মসহ প্রেরণ করা হয়েছে”।তাদের এসব নতুন আবিষ্কৃত কিছু মাসআলা এমন রয়েছে যেগুলো পালন করতে গিয়ে মুসল্লী অস্বাভাবিক অস্থিরতা ও ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি হয়। অথচ নামায হলো, ধীর-স্থিরতা, খুশু-খুজু ও আল্লাহর সম্মুখে বান্দার বিনয় প্রকাশের মাধ্যম।নামাযের বিধি-বিধানে এসব নব আবিষ্কৃত মাসআলার উদ্ভাবকগণ অনেক সময় বলে থাকেন, ইসলামের শুরু থেকে রাসূল স. এর উম্মতগণ এই সুন্নত ছেড়ে দিয়েছে, সুতরাং আমরা এসব মাসআলার দ্বারা ইসলামের এই অপূর্ণতা দূর করতে চাই। প্রকারান্তরে তারা এই বক্তব্যের দ্বারা রাসূল স. এর সমস্ত উম্মতকে গোনাহগার সাব্যস্ত করে থাকে”

নামাযে নব আবিষ্কৃত বিদয়াতের উৎপত্তির কারণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ড. বকর আবু যায়েদ লিখেছেন,

“ নামাযের অধিকাংশ নব আবিষ্কৃত মাসআলার ক্ষেত্রে কিছু মানুষ যে ভ্রান্ত বুঝের স্বীকার হয়েছে এর মৌলিক কারণ হলো, হাদীসের বুঝ অর্জনে বাড়াবাড়ি, প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত অর্থ, আরবী ভাষার গ্রহণযোগ্য ব্যবহার ও মূলনীতি, হাদীসের মূলনীতি ও ফিকহের মূলনীতির প্রতি দৃষ্টি না দেয়া। দলিল প্রদানে সুস্থ ধারার ব্যত্যয় এবং গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির থেকে দূরে সরে যাওয়ার ভয়ংকর পরিণতি হলো এসব নতুন আবিষ্কৃত বিদয়াতসমূহ। সেই সাথে নামাযের ধীরস্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রচলিত সুন্নাহ থেকে বিমুখ থাকা, ফিকহের কিতাবসমূহ থেকে দূরে থাকা এবং ইমামগণের মতবিরোধ সম্পর্ক অনবহিত থাকার একটি মারাত্মক পরিণতি হলো নামাযের শরীয়তের বিধি-বিধানে এসব বিদয়াতের সৃষ্টি। অথচ ফিকহের কিতাব ও ইমামগণের মতবিরোধ সম্পর্কে অবগত হলে সে কুরআন ও হাদীস থেকে মাসআলা আহরণের উৎস, পদ্ধতি ও সুস্থ ধারা সম্পর্কে সচেতন থাকার কারণে এসব বিদয়াত থেকে দূরে থাকতো”


প্রথম বিদয়াত: নামাযে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রাখা

নামাযে নতুন সৃষ্ট একটি বিদয়াত হলো পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাড়ানো। চৌদ্দ শ’ বছরের ইতিহাসে তথাকথিত আহলে হাদীসদের পূর্বে কেউ এই মাসআলার উপর আমল করেনি। চার মাজহাবের একটি মাজহাবেও এই মাসআলা গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমানে আহলে হাদীস এই বিদয়াত চালু করেছে। রাসূল স. এর সুন্নতের সাথে এর বিন্দুমাত্র কোন সম্পর্ক নেই। বর্তমানে আহলে হাদীসদের আমল থেকে দেখা যায়, তারা সম্পূর্ণ নামাযে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাড়ায় না, বরং পায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুলের সাথে অপরের কনিষ্ঠাঙ্গুল মিলিয়ে দাড়ায়। এভাবে বৃদ্ধাঙ্গুল মিলিয়ে দাড়াবার কথা ইসলাম শরীয়তের কোথাও নেই। এটি আহলে হাদীসদের মনগড়া একটি আবিষ্কার। আমরা প্রথমে এবিষয়ে সালাফী আলেমসহ বিখ্যাত আলেমদের ফতোয়া উল্লেখ করবো। এরপর হাদীস, খোলাফায়ে রাশেদীন ও সালাফে-সালেহীনের আমলের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রাখা সম্পর্কে বিখ্যাত আলেমগণের বক্তব্য


১. আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. এর বক্তব্য:

আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. বোখারী শরীফের বিখ্যাত  ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফয়জুল বারীতে আহলে হাদীসদের সৃষ্ট এ মাসআলাকে তাদের নিজস্ব আবিষ্কার আখ্যায়িত করেছেন এবং বুকের উপর হাত বাধার মতো এটিকেও একটি বিদয়াত সাব্যস্ত করেছেন। [ফয়জুল বারী, খ.২, পৃ.৩২]

২. ইবনে উসাইমিনের বক্তব্য:

সালাফী শায়খ সালেহ আল-উসাইমিনকে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রাখা সম্পর্কে প্রশ্ন হয—“ কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে সঠিক কোনটি? পায়ের আঙ্গুলের অগ্রভাগের মাধ্যমে কাতার সোজা করতে হবে, না কি গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলাতে হবে? পাশের মুসল্লীর পায়ের সাথে পা মিলানো কি সুন্নত?”

শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ: এর উত্তরে লিখেছেন,

“الصحيح أنّ المعتمد في تسوية الصف ، محاذاة الكعبين بعضهما بعضا ، لا رؤوس الأصابع ، و ذلك لأنّ البدن مركب على الكعب . و الأصابع تختلف الأقدام فيها ، فقدم طويل و آخر صغير فلا يمكن ضبط التساوي إلا بالكعبين. وأما إلصاق الكعبين بعضهما ببعض فلا شك أنه وارد عن الصحابة رضي الله عنهم ، فإنهم كانوا يسوون الصفوف بإلصاق الكعبين بعضهما ببعض ، أي : أنّ كل واحد منهم يلصق كعبه بكعب جاره لتحقيق المساواة . و اهذا إذا تمت الصفوف و قام الناس ،ينبغي لكل واحد أن يلصق كعبه بكعب صاحبه لتحقيق المساواة فقط و ليس معنى ذلك أنه يلازم هذا الإلصاق و يبقى ملاصقا له في جميع الصلاة. و من الغلو في هذه المسألة ما يفعله بعض الناس: تجده يلصق كعبه بكعب صاحبه و يفتح قدميه فيما بينهما حتى يكون بينه و بين جاره في المناكب فرجة ، فيخالف السنة في ذلك. و المقصود أنّ المناكب و الأكعب تتساوى.

“ কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি হলো, গোড়ালীসমূহ বরাবর রাখা। পায়ের আঙ্গুলসমূহ মেলানাো বা বরাবর রাখা সঠিক পদ্ধতি নয়। কেননা মানুষের গোড়ালী একই গঠনের হয় অর্থাৎ কিছুটা উত্থিত ও গোলাকার। কিন্তু পায়ের আঙ্গুলসমূহ বিভিন্ন রকম হয়। কারও পা বড় হয, কারও পা ছোট হয়। সুতরাং কাতার সোজা করার জন্য পায়ের গোড়ালীসমূহ বরাবর রাখাটাই সঠিক পদ্ধতি। পাশের মুসল্লীর গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মেশানোর মাসআলা হলো, নি:সন্দেহে সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে এটি বর্ণিত। কেননা তারা কাতার সোজা করার জন্য গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মেলাতেন। অর্থাৎ কাতার সোজা হয়েছে কি না এটা দেখার জন্য তারা গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মেলাতেন। মানুষ যখন কাতার সোজা করবে এবং নামাজের জন্য দাড়াবে তখন একজন অপরজনের গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলিয়ে দেখবে যে কাতার সোজা হয়েছে কি না। গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মেলানো দ্বারা কখনও এটিউদ্দেশ্য নয় যে, সবসময় গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলিয়ে রাখবে এবং সম্পূর্ণ নামাযে এভাবে লাগিয়ে রাখবে। এই মাসআলায় কিছু মানুষ বাড়াবাড়ি করে থাকে।তারা একজনের গোড়ালীর সাথে অপরের গোড়ালী লাগিয়ে রাখে এবং দু’পায়ের মাঝে অস্বাভাবিক ফাকা রাখে, ফলে তাদেরদু ’জনের কাধের মাঝেফাকাথাকে।এক্ষেত্রে তারা সুন্নতের বিরোধী কাজ করে থাকে। মূলউদ্দেশ্যহলো, কাধ ও গোড়ালী বরাবর থাকবে।

মাজমুয়াতুলফাতাওয়া, খ.১৩, ফতোয়ানং৪২৮

৩.ইবনে বাজের বক্তব্য:

ইবনে বাজ রহ. কে পায়ের সাথে পা মিলানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তথাকথিত আহলে হাদীসদের এই বেদয়াতী মতবাদ খন্ডন করেন।

س: ما هي السنة في رص الصفوف للمصلين هل يضع المصلي بين قدمه مقدار أربعة أصابع أم يلزق قدمه بقدم الذي بجانبه؟ج: السنة التراص في الصفوف وعدم ترك شيء بين الأقدام تكون قدمه ملزقا بقدم صاحبه من غير إيذاء ، من غير محاكة ولا إيذاء، بل يقرب قدمه من قدمه ولا يفشح يقوم بجملته كله بعض الناس يفشح يأخذ مكان اثنين ، هذا لا يصلح، ولكنه يقرب منه كل واحد يدنو من الآخر حتى يسدوا الفرجة، ولهذا قال النبي صلى الله عليه وسلم: « “تراصوا وسدوا الخلل وسدوا الفرج ولا تتركوا فرجات للشيطان” » قال أنس، وكان الرجل ليلزق قدمه بقدم صاحبه، يعني يسدون الخلل، وليس معناه أن يحاكه ويؤذيه لا، لا يحاكك الرجل بالرجل، ولكنه يلزقها حتى لا تكون فرجة بينهما.

প্রশ্ন: কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে সুন্নত নিয়ম কী? মুসল্লী নিজের উভয় পায়ের মাঝে চার আঙ্গুল ফাকা রাখবে না কি পাশের মুসল্লীর পায়ের সাথে পা লাগিয়ে দাড়াবে?উত্তর: সুন্নত হলো কাতারগুলো সোজা রাখা এবং অন্যের পা স্পর্শ করা, তাকে কষ্ট দেয়া অথবা পায়ের সাথে ঘষাঘষি করা ব্যতীত অপর মুসল্লীর পায়ের বরাবর পা রাখবে যেন উভয পায়ের মাঝে বেশি ফাকা না থাকে। 

এমনভাবে পা রাখবে যেন অন্যের পায়ের কাছাকাছি হয়। তবে এক্ষেত্রে নোংরাভাবে দাড়াবেনা। সাধারণভাবে দাড়াবে।কিছুকিছু মানুষ নিকৃষ্টও নোংরাভাবে দাড়ায়। পায়ের সাথে পা মিলাতে গিয়ে দু’জনের জায়গা নিয়ে দাড়ায়। এটা সঠিক নয়।বরং একে অপরের কাছাকাছি দাড়াবে যেন উভয়ের মধ্যকার ফাকা জায়গা বন্ধ হয়।এজন্য রাসূলস. বলেছেন, তোমরাপরস্পর মিলে দাড়াও। মাঝের ফাকা জায়গা বন্ধ করো। শয়তানের জন্য কোন ফাকা জায়গা রেখোনা।হযরত আনাস রা. বলেন, সাহাবায়ে কেরাম একজনের পায়ের সাথে অপরের পা মিলাতেন।কিন্তু পায়ের সাথে পা মিলোনার অর্থ এই নয় যে, একজনের পা অপরজনের পাশের সাথে স্পর্শ করাতেন এবং তাকে কষ্টদিতেন। এক্ষেত্রে একজন অপরজনের পা স্পর্শকরবেনা।বরং এমনভাবে মিলিয়ে দাড়াবে যেন মাঝে ফাকা না থাকে”

৪. শায়খ আহমাদ ইবনে ইয়াহইয়া নাজমীর বক্তব্য:

كذلك أيضاً من المساواة أن تجعل بين قدميك شبراً – بس- فإذا جعلت بين قدميك شبراً فإنه يكون مع القدمين بقدر منكبيك، لا تجمع القدمين سواء فتأخذ منكبيك مساحةً أكثر من مساحة القدمين، ولا تجعل قدميك متباعدة؛ فإذا باعدت بين قدميك حينئذ لا يمكن أن يكون جارك يتمكن من وضع منكبه مع منكبك مساوياً له”

“ পরস্পর সোজা হয়ে দাড়ানোর একটি অংশ হলো উভয় পায়ের মাঝে এক বিঘাত পরিমাণ ফাকা রাখা। ব্যাস। যখন আপনি উভয় পায়ের মাঝে এক বিঘাত পরিমাণ ফাকা রাখবেন তথন তা আপনার কাধের সমান হবে। উভয় পা একেবারে মিশিয়ে রাখবে না, তখন আপনার কাধের পরিমাণ পায়ের থেকে বেশি হবে। আবার উভয় পা খুব বেশি ছড়িয়ে রাখবে না। যদি উভয় পা বেশি ছড়িয়ে দাড়ান, তখন আপনার পাশের মুসল্লী আপনার কাধের সাথে কাধ মিলিয়ে দাড়াতে পারবে না”।“আদদাওরাতুল ইলমিয়্যা বিহুফরিল বাতিন, ক্যাসেট নং ৫, শায়খ নাজমী”।


৫. ড. বকর আবু যায়েদের বক্তব্য:

সৌদি মুফতী বোর্ডের সম্মানিত সদস্য ড. বকর আবু যায়েদ তার লা জাদিদা ফি আহমকামিস সালাহ (নামাযের বিধানে নতুনত্ব নেই)  বইয়ে লিখেছেন, 
“ কোন দলিল ছাড়া নামাযে কাতার সোজা করার নতুন একটি পদ্ধতির আবিষ্কৃত হয়েছে। যেটি আমরা বর্তমানে কিছু মুসল্লীকে করতে দেখি। তারা ডান ও বামপাশের মুসল্লীর পায়ের পিছনের অংশের সাথে নিজের পায়ের পিছনের অংশ মিলিয়ে দাড়ায়, যেন তাদের গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলে থাকে। এটি হাদীসে বর্ণিত পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নতুন আবিষ্কৃত পদ্ধতি। সুন্নাহ অনুসরনে এটি সীমাহীন বাড়াবাড়ি বৈ কিছুই নয়।[লা জাদিদা ফি আহকামিস সালাহ, পৃ.১২]

৬. মাজলিসুল উলামা সাউথ আফ্রিকার ফতোয়া:

সাউথ আফ্রিকার সম্মানিত উলামা বোর্ডের মুফতীগণ এবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফতোয়া দিয়েছেন। এ ফতোয়ায় পায়ের সাথে পা লাগিয়ে দাড়ানো বিদয়াত হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সাউথ আফ্রিকার সম্মানিত উলামা বোর্ডের ফতোয়ায় রয়েছে,

One of the erroneous practices of the Salafis is their act of spreading their legs wide apart during Salaat. In the bid to touch the toes of the musalli standing adjacent to them, they disfigure their stance and  ruin their composure with the mental preoccupation of touching the toes of the musallis standing on both sides in the Saff during Jamaat Salaat. Even when performing Salaat alone, they stretch the legs hideously apart. But for this innovation they have absolutely no Shar’i evidence. A solitary Hadith which makes reference to ‘foot with foot’ has been grievously misunderstood and misinterpreted by them. Besides their misinterpretation, they have intentionally ignored all the other Shar’i proofs which refute their interpretation. A perusal of the relevant Ahadith on this subject will convince every unbiased Muslim that the Salafi interpretation of the Hadith is a concoction of the nafs. It is a concoction designed and prepared by shaitaan to create rifts and discord in the Ummah. When people opt to abandon the practices which the Aimmah Mujtahideen have reported on the basis of the authority of the Sahaabah, then shaitaani manipulation is evident.
All four Math-habs of the Ahlus Sunnah Wal Jama’ah unanimously refute the Salafi contention on the position to be adopted when standing for Salaat. None of the Math-habs teaches that the legs should bespread out widely when standing for Salaat nor that the toes of the Musalli alongside should be touched. Some of the Salafis go to great lengths in spreading their legs in the bid to touch the next man’s toes causing annoyance and much irritation.

“ বর্তমান সময়ে নামাযের পদ্ধতির ক্ষেত্রে সালাফীদের একটি ভুল আমল হলো, নামাযে খুব বেশি পা ছড়িয়ে দাড়ানো। জামাতের নামাযে তারা পাশের মুসল্লীর পায়ের অগ্রভাগের সাথে পা মিলানোর জন্য বিকৃতভাবে দাড়ায় এবং অন্যের পা স্পর্শের চিন্তায় নামাযের অভ্যন্তরীণ খুশু-খুজু নষ্ট করে। এমনকি একাকী নামায আদায়ের সময়েও তারা অস্বাভাবিক পা ফাক করে দাড়িয়ে থাকে। অথচ তাদের এই নতুন আমলের পক্ষে শরীয়তের কোন দলিল নেই। তারা পায়ের সাথে পা মিলানো সংক্রান্ত একটি হাদীসকে মারাত্মকভাবে ভুল বুঝেছে এবং মানুষের সামনে এর বিকৃত ব্যাখ্যা করেছে। তাদের বিকৃত ব্যাখ্যার পাশাপাশি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ সংক্রান্ত অন্যান্য হাদীসকে উপেক্ষা করে থাকে। অথচ এসব হাদীস তাদের বিকৃত ব্যাখ্যা খন্ডন করেছে। এ সংক্রান্ত সমস্ত হাদীস অধ্যয়নের পর একজন নিরপেক্ষ মুসলিমের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সালাফীদের হাদীসের ব্যাখ্যাটি তাদের প্রবৃত্তির পূজা ছাড়া কিছুই নয়। মুসলিম উম্মাহের মাঝে অনৈক্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য এটি মূলত: শয়তানের একটি দূরভিসন্ধিমূলক ব্যাখ্যা। সাহাবায়ে কেরাম থেকে আইম্মায়ে মুজতাহিদীন যেসব আমল বর্ণনা করেছেন, একজন মানুষ যখন এগুলো পরিত্যাগ করে, তখন শয়তানী ব্যাখ্যা তার নিকট দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়।সুন্নী চার মাজহাবের সবগুলো মাজহাব সালাফীদের নামাযে দাড়ানোর নতুন আবিষ্কৃত এ পদ্ধতি খন্ডন করেছে। কোন মাজহাবে একথা নেই যে, নামাযে দাড়ানোর সময় পা এতো বেশি ফাকা রাখতে হবে যেন পাশের মুসল্লীর পা স্পর্শ করে। কিছু কিছু সালাফী পাশের মুসল্লীর পায়ের অগ্রভাগ স্পর্শের জন্য এতো বেশি পা ফাকা করে যে এটি মানুষের মাঝে বিরক্তি ও উপদ্রবের কারণ হয়”।

ফতোয়ার লিংক

৭. মুফতী মুহাম্মাদ ইউসুফ ডাংকা এর ফতোয়া


শায়খ মুফতী মুহাম্মাদ ইউসুফ ডাংকা নামাযে পায়ের সাথে পা মিলানোর বিষয়ে একটি ফতোয়া দিয়েছেন। এখানে তিনি হাদীস, খোলাফায়ে রাশিদীন ও সালাফে- সালেহীনের আমল থেকে প্রমাণ দিয়েছেন যে নামাযে কাধের সাথে কাধ মিলানো সুন্নত। পায়ের সাথে পা মিলানো সুন্নত নয়।

তিনি উপসংহারে লিখিছেন,

In conclusion, it is proven from the Ahadith related from the Prophet , the sayings and actions of the Khulafaa Rashideen and other Companions and the rulings of the Salaf Saliheen رحمه الله تعالى اجمعينthat the joining of the feet in Salah with congregation is not from amongst the Sunnahs of performing Salah.

“উপসংহারে আমরা বলবো, রাসূল স. এর বেশ কয়েকটি হাদীস, খোলাফায়ে রাশিদীন ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের আমল ও বক্তব্য এবং সালাফায়ে সালেহীনের সিদ্ধান্ত থেকে এটি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে নামাযে পায়ের সাথে পা মিলানো নামাযের কোন সুন্নত নয়”।

বিস্তারিত ফতোয়া

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 684
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83