অনেকের ধারণা, ইবনে তাইমিয়া ও তাইমীদের সাথে আমাদের শাখাগত মাসআলা - মাসাইলের বিরোধ। চার ইমামসহ অন্যান্য ইমামদের মাঝে যেমন বহু মাসআলা-মাসাইলের মতবিরোধ আছে, এধরণেরই কিছু বিরোধ ইবনে তাইমিয়ার সাথে অন্যদের।
বাস্তবতা হলো, উপরের ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। ইবনে তাইমিয়ার সাথে আহলে সুন্নতের মূল বিরোধ একেবারে আকিদার বুনিয়াদি বিষয়ে। মৌলিক আকিদার এই বিরোধের উপর মানুষের ঈমান ও কুফুর নির্ভরশীল। ইসলামের মূল মর্ম তাওহীদ, আল্লাহর একত্ববাদ, সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে মুক্ত হওয়া, পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামের আকিদা থেকে শুরু করে দ্বীনের একেবারে মৌলিক অসংখ্য বিষয়ে তাইমীদের সাথে আহলে সুন্নতের বিরোধ। এসব বিরোধের যে কোন একটি বিষয়ই কারও কুফুরী বা ভ্রষ্টতার জন্য যথেষ্ট। ইবনে তাইমিয়ার মাঝে এজাতীয় অনেকগুলো বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে। যদিও আহলে সুন্নতের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম তাকে কাফের বলেন না, তবে তার ভ্রষ্টতার বিষয়ে অসংখ্য ইমামের বক্তব্য রয়েছে।
এই বিরোধ যে একেবারে মৌলিক বিষয়ে, সেটি অন্যান্য তাইমীরাও স্বীকার করেছে। পববর্তীতে আমরা তাদের বক্তব্য উল্লেখ করব ইনশা আল্লাহ। তাইমীদের সাথে যেহেতু আমাদের একেবারে মৌলিক আকিদার বিরোধ, এজন্য আমাদের প্রতি তাদের আচরণ কখনও শাখাগত বিরোধের মতো ছিলো না। একেবারে শুরু থেকে তারা আহলে সুন্নতের প্রতি গালাগালি, মিথ্যা অপবাদ ও শিরক-বিদয়াত সন্ত্রাস করে আসছে। বিষয়গুলো যে তার পরবর্তী অনুসরারীরা করেছে, এমন নয়। খোদ ইবনে তাইমিয়াও এজাতীয় কাজে লিপ্ত ছিলেন। পরবর্তী তার অনুসারী তাইমীদের অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। তারা ইবনে তাইমিয়ার এই নতুন ভ্রষ্টতাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সারা মুসলিম উম্মাহকে কাফের-মুশরিক ও মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাদের রক্ত ও সম্পদ হালাল করেছে। হাজার হাজার উলামায়ে কেরামকে হত্যা করেছে। লক্ষ্য লক্ষ্য সাধারণ মুসলমানদেরকে হত্যা করেছে। তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ লুট করেছে। এগুলোর সবই তাদের নিজস্ব রচনা থেকে প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য বিষয়। এমনকি এখনও পর্যন্ত তারা ইবনে তাইমিয়ার এই ভ্রষ্টতা অনুসরণ করে উম্মাহের রক্ত ঝরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আইএস বা দায়েশ খারেজীরা ইরাক, সিরিয়া ও আফগানে অসংখ্য সাধারণ মুসলমানকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে হত্যা করেছে। উলামায়ে কেরামকে তাদের দরসে, মসজিদে ও খানকায় বোমা মেরে হত্যা করছে। শত শত মুসল্লিতে ভরা মসজিদে নামাজরত অবস্থায় বোমা মেরে তাদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলা হচ্ছে। এসব কিছুর মূলে রয়েছে ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে আব্দিল ওয়াহহাবের আকিদাগত দর্শন ও তাদের চিন্তাগত ভ্রষ্টতা।
মুসলমানদেরকে অন্যাভাবে কাফের ও মুরতাদ আখ্যা দেয়ার এই প্রবণতা যে নতুনভাবে শুরু হয়েছে এমন নয়। খোদ ইমাম আবু হানিফা রহ: কে নানা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কাফের ও মুরতাদ বলার চেষ্টা করা হয়েছে। পরবর্তীতে ইবনে তাইমিয়া এগুলোকে একটি সুসংগঠিত দর্শনের রুপ দিয়েছেন। যেখানে একজন সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তাদের এই চিন্তা-চেতনা গ্রহণ করে রক্ত-পিপাসু তাকফিরী হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে তাইমী - নজদী শায়খ আব্দুল্লাহ গুনাইমানের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখ করাত মত। তিনি লিখেছেন,
وقد انتسب إلى الأشعري أكثر العالم الإسلامي اليوم من أتباع المذاهب الأربعة، وهم يعتمدون على تأويل نصوص الصفات تأويلاً يصل أحياناً إلى التحريف، وأحياناً يكون تأويلاً بعيداً جداً، وقد أمتلأت الدنيا بكتب هذا المذهب، وادعى أصحابها أنهم أهل السنة
অর্থাৎ “বর্তমান মুসলিম বিশ্বের চার মাজহাবের অধিকাংশ ইমাম আশয়ারীর আকিদা-বিশ্বাস অনুসরণ করে থাকে। আর এক্ষেত্রে তারা সিফাতের বিষয়গুলোকে তা’বীল করে। এই তা’বীল কখনও বিকৃতির পর্যায়ে চলে যায়। কখনও অনেক দূরবর্তী তা’বীল হয়। এই মাজহাবের কিতাবাদি দিয়ে পুরো দুনিয়া ভরে গেছে। আর এর অনুসারীরা নিজেদেরকে আহলে সুন্নত দাবী করে থাকে।”
এরপর নজদী শায়খ গুনাইমান যে কথাটি বলেছেন, সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন,
هذا ولابد لعلماء الإسلام -ورثة رسول الله – صلى الله عليه وسلم من مقاومة هذه التيارات الجارفة، على حسب ما تقتضيه الحال، من مناظرات، أو بالتأليف، وبيان الحق بالبراهين العقلية والنقلية، وقد يصل الأمر أحياناً إلى شهر السلاح
অর্থাৎ “সুতরাং বর্তমানে ইসলামের আলিম যারা আল্লাহর রাসূলের উত্তরসূরী তাদের জন্য আবশ্যক হল, তারা যেন ইসলাম বিধ্বংসী এই স্রোতের প্রতিরোধে সময়োপযোগী বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যেমন, মুনাজারা (বিতর্ক), কিতাব সংকল, আকলী ও নকলী দলিলের আলোকে সত্য তুলে ধরা। কখনও কখনও প্রয়োজনে অস্ত্র ব্যবহার করা।
[ শরহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহীল বোখারী , আব্দুল্লাহ গুনাইমান, খ: ১, পৃ: ২৬ ]
এই তাইমী-নজদী আব্দুল্লাহ গুনাইমানের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। অধিকাংশ মুসলিম উম্মাহকে আশয়ারী-মাতুরিদি আকিদার জন্য তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র-ধারণের অনুমতি দিচ্ছেন তিনি। ইন্নালিল্লাহ।
দু:খজনক বিষয় হলো, এই মানসিকতা শুধু তাদের লেখনীতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তারা বাস্তবেও এর প্রয়োগ করে থাকে। কোথাও সামান্য ক্ষমতা পেলেই তারা আশয়ারী-মাতুরিদি আকিদার লোকদেরকে শিরক-বিদয়াতসহ নানা অপবাদ দিয়ে তাদেরকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে হত্যা করে থাকে।
বিষয়টি বোঝার জন্য ছোট্র একটি উদাহরণ দিয়ে আমরা মূল আলোচনায় ফিরে যাব। নব্বইয়ের দশকে আল-জেরিয়াতে সালাফীপন্থী কিছু দল জি-হা-দ শুরু করে। এদের সাথে বি-ন লা-দেন ও আ-ইমান জা-ওয়াহেরী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল। এদের নাম ছিলো, Armed Islamic Group of Algeria বা সংক্ষেপে GIA. এই গ্রুপকে যে বি-ন-লাদেন ও আ-ই-মান জাওয়ারেহী সহযোগিতা করেছিল তার অনেক প্রমাণ রয়েছে। যেমন, শায়খ আবু মুসআব আস-সূরী যাকে আ-ল-কা-য়দার গ্লোবাল জি-হা-দ এর আর্কিটেক্ট বলা হয়ে থাকে, তিনি আল-জেরিয়ার ঘটনা বিশ্লেষণ করে একটি কিতাব লিখেছেন। এর নাম দিয়েছেন, ‘মুখতাসারু শাহাদাতি আলাল জি-হা-দি ফিল জাযাইর’।
কিতাবটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওঠেছে। এগুলো নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ। এ কিতাবে GIA এর সাথে বি-ন লা-দেন ও জা-ও-য়াহেরীর সহযোগিতা সম্পর্কে আবু মুসআব সূরী লিখেছেন,
এক পর্যায়ে আবু আব্দির রহমান আমীন নামের এক মুরগী বিক্রেতা এই GIA এর প্রধান হয়। যেহেতু এই গ্রুপটি শুরু থেকে তথাকথিত সালাফী দাওয়াত ও মানহাজের উপর ছিলো, তারা প্রতিপক্ষকে বিদয়াতের অভিযোগে হত্যা করতে শুরু করে। তাদের এই বিদয়াতের লিস্টে সবার উপরে ছিলো আশয়ারী-মাতুরিদি আকিদা, তাসাউফ ও চার মাজহাবের অনুসরণ। এমনকি তাদের সহযোগী মুজাহিদদেরকে এসব অভিযোগে হত্যা শুরু করে। আবু মুসআব আস-সূরীর খুব কাছের ব্যক্তি ছিলেন শাইখ মুহাম্মাদ সাইদ। যিনি আফ-গ-ান জি-হাদেও অংশ নিয়েছিলেন। শেখ মুহাম্মাদ সাইদকেও এক সময় তারা আশয়ারী, বিদয়াতীসহ আরও কিছু অভিযোগ করে হত্যা করে। মজার ব্যাপার হলো, মুহাম্মাদ সাইদ ও তার সহযোগিদের হত্যাকে জাস্টিফাই করার জন্য আবু কাতাদা ফিলিস্তিনী তাদের ‘নাশরাতুল আনসার’ ম্যাগাজিনে বেশ কয়েকটি আর্টিকেল প্রচার করে। এবং এধরণের বিদয়াতীদেরকে হত্যা করাটা প্রশংসনীয় কাজ হিসেবে তুলে ধরে। আর এর পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য খালিদ বিন আব্দুল্লাহ আল-কাসারী জায়াদ বিন দিরহামকে হত্যা করেছিল, সেই উদাহরণ টেনে বর্তমান যুগের বিদয়াতীদের হত্যার ব্যাপারেও উদ্বুদ্ধ করে। আবু মুসআব সূরী আবু কাতাদাহ ফিলিস্তীনী এই ঘৃণ্য কাজটি তার বইয়ের ৪০ পৃষ্ঠা থেকে পরবর্তী বেশ কয়েক পৃষ্ঠায় তুলে ধরেছেন।
আবু মুসআব সূরী তার বইয়ের ৫৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
“লি-বিয়ার সশস্ত্র ইসলামী জি-হা-দী গ্রুপের কিছু মু-জা-হিদ যারা GIA এর সাথে কাজ করত, তারা আল-জেরিয়া থেকে GIA এর ফাঁদ থেকে পলাতে সক্ষম হয়। তারা প্রায় মো’জিযার মতো করে আশ্চর্যজনকভাবে সেখান থেকে পালিয়ে বেঁচে তাদের জামায়াতের কাছে ফিরে আসে। এদেরই একজন পরবর্তীতে লন্ডনে এলে তার কাছ থেকে GIA এর ভয়ঙ্কর বাস্তবতা সামনে আসে। একই সময়ে GIA এরও কিছু সদস্য তাদের এই ন্যাক্কারজনক শাসন থেকে পালিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। তাদের কাছ থেকেও মূল বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে জানার সুযোগ হয়। আমরা যেই উপসংহারে পৌঁছেছিলাম, সেটি যে বাস্তব ছিলো তাও নিশ্চিৎ হয়ে যাই। মূল বিষয় ছিলো, GIA ও আবু আব্দির রহমান আমীনের গ্রুপটি শাইখ মুহাম্মাদ সাইদ ও তার দলবলকে ধোঁকা দিয়ে হত্যা করে। না তাদের কোন শরয়ী বিচার করেছে বা তাদের এই হত্যাকান্ড নিয়ে তারা চিন্তিত ছিলো। শাইখ ও তার দলবল যখন GIA এর নানা বিচ্যূতি নিয়ে আলাপ করতে আসে তখন তারা শাইখ ও তার সাথীদেরকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে। একইভাবে তারা আফগান আরব মু-জ-াহিদদেরকেও হত্যা করে। এদের হত্যার পেছনে মূল অভিযোগ ছিলো, তারা বিদয়াতী ছিলো এবং বিশুদ্ধ সালাফী আকিদা লালন করত না। এবং তারা তাদের কিছু কাজের প্রতিবাদ করেছিল। একইভাবে তারা লিবিয়ান মু-জা-হিদীনদেরকেও ধোঁকা দিয়ে হত্যা করে। এদেরকে হত্যার পেছনে মূল কারণ ছিল, বিদয়াতী হওয়া ও তাদের আমীরের হাতে বাইয়্যাত না হয়ে নিজেদের দলের আমীরের অধীনে থাকা।
একইভাবে তারা সাধারণ আল-জেরিয়ান গ্রামবাসীদের উপর নৃশংস গণহত্যা চালায়। সরকারের সহযোগিতা ও অস্ত্রধারণ ছিলো এসব সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার মূল অভিযোগ। এমনকি তারা মহিলাদের ইজ্জ লুন্ঠন করে, জিনা করে ও সম্পদ লুন্ঠন করে। এটাকে বৈধ করার জন্য তারা বলে, তাগুতের মহিলাদের বন্দী করা জায়েজ। এজাতীয় ভয়ঙ্কর বর্ণনাগুলো তাদের বক্তব্যে ওঠে আসে।”
[মুখতাসারু শাহাদাতি আলাল - জি-হাদী ফিল জা-যাইর, পৃ: ৫৩-৫৪ ]
আল-জেরিয়ান এই সালাফী - জি-হাদী গ্রুপ যেই বর্বরতা ও নৃশংসতা চালিয়েছিল, এটি বর্তমানের আইএস থেকে কোন অংশে কম ছিলো না। যদিও এদের এই গ্রুপে সরকারী গুপ্তচর ঢুকে যাওয়ার কথাও আবু মুসআব সূরী লিখেছেন, কিন্তু এরপরও মৌলিকভাবে এই জাময়াতের চিন্তা-চেতনাতেই মারাত্মক পর্যায়ের সমস্যা ছিলো। আল-জেরিয়ার ময়দানে GIA এসব বর্বরতা ও নৃশংসতা চালাত আর এদিকে লন্ডনে বসে কা-য়-দার সিনিয়র পর্যায়ের শায়খ আবু কা-তা-দা ফিলিস্তীনী এগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করে তাদের সাফাই দিতে আর্টিকেল লিখতেন। এই বিষয়গুলো আমরা অন্য কোথাও আরও বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ।
এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, GIA অন্যান্য মুজা-হিদীনকে বিভিন্ন বিদয়াতের অভিযোগে হত্যা করেছে। কী ছিলো এসব বিদয়াত? আর তাদের এজাতীয় চিন্তা-চেতনার মূলই বা কী ছিলো? এর সহজ উত্তর হলো, তাদের মানদন্ডের সালাফী না হওয়াটাই মূল অপরাধ ছিলো। সালাফী না হলেই তাকে বিদয়াতী অভিযোগে তারা হত্যা করেছে। তাদের এই বিদয়াতের বিষয়টিও আবু মুসআব সূরী কিছুটা খোলাসা করার চেষ্টা করেছেন।
আবু মুসআব সূরী তার বইয়ের ৬৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
“ GIA এর এই দলটি মূলত: ছিল কিছু কুখ্যাত জাহিলদের দল। এদের নেতৃত্বে ছিলো, সালাফিয়াতের আশ্চর্যজনক বুঝ ধারণকারী কট্ররপন্থী কিছু লোক। তাদের এই আশ্চর্যজনক সালাফী দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে ছিলো, তারা চার মাজহাবকে, ইসলামী অন্যান্য দলের চিন্তা-চেতনাকে এমনকি অন্য জিহাদী দলগুলোর চিন্তা-চেতনাকে বিদয়াত মনে করত। আর এসব চিন্তা-চেতনার অনুসারী সকলেই এদের কাছে সঠিক পথ থেকে বিচ্যূত বিদয়াতী। এদের এই বিদয়াতীর লিস্টে বর্তমান ও পূর্ববর্তী অসংখ্য বড় বড় ইমাম ও আলিম ছিলো।
আমি যখন তাদের চিন্তা-চেতনা ও শরয়ী ফয়সালার উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তখন বলল, তাদের একটি শরয়ী বোর্ড ছিলো। এই শরয়ী বোর্ডই তাদের বিকৃত চিন্তা-চেতনা অনুযায়ী সব ধরণের ফতোয়া ও দলিল দিত। এক্ষেত্রে হয়ত তারা কুরআন - সুন্নাহের বক্তব্য অনুধাবনে অক্ষম নিজেদের বিকৃত ও সংকীর্ণ বুঝ অনুযায়ী মাসআলা দিত। যাকে এরা নাম দিত কুরআন-হাদীসের ‘দলিল’। অথচ এই অথর্বদের অধিকাংশ সঠিকভাবে আরবীও উচ্চারণ করতে পারত না। অথবা তারা ইমাম ইবনে তাইমিয়ার কিতাব থেকে দলিল দিত। যাকে তারা আল-জেরিও ভাষায় বলত ‘শেখ আহমাদ’। এই দু’টি উৎসই মূলত: তাদের এই শরয়ী বোর্ডের চিন্তা-চেতনার মূল ছিলো। আর এটিই ছিলো তাদের পুরো দ্বীন ও ইসলাম।
এদের এই চিন্তা-চেতনা উৎসারিত বহু অতি আশ্চর্যজনক মাসআলা - মাসাইল আমাকে শুনিয়েছে। জি-হা-দ, রাজনীতির বাইরেও পাক-পবিত্রতা, নামাজ ও ইবাদত সংক্রান্ত বহু আশ্চর্যজনক বিচ্ছিন্ন মতামত তাদের ছিলো। তাদের সেসব আশ্চর্যজনক মাসআলাসমূহের একটি মাসআলা এখনও আমার মনে আছে। তাদের মতে শুধু জি-হা-দ এ গেলেই তায়াম্মুম জায়েজ। যদিও নিরাপদে পানি, ঝর্ণার পাশে থাকুক।
আমি যখন তাদেরকে লন্ডন থেকে আবু কা-তাদা ফিলিস্তিনীর প্রচারণার প্রভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তখন বলল, তারা আল-জেরিয়াতে এদের কথা তেমন শোনেনি। বরং সেখানে তাদের শরয়ী বোর্ডই মূল ছিলো। আর সেখানে GIA এর প্রধানী আবু আব্দির রহমান আমীনের পক্ষ থেকে নিযুক্ত একজন ভয়ঙ্কর শরয়ী কাজী ছিলো। এদের মাধ্যমে আমীন তার অনুসারীদেরকে নিয়ে হাসান সাব্বাহ ও হাশাশীনদের মতো নীতি অনুযায়ী চলত। আর এদের ভাষা ছিল অস্ত্র ও হত্যা।”
[মুখতাসারু শাহাদাতি আলাল - জি-হাদী ফিল জা-যাইর, পৃ: ৬৩ ]
এখানে মজার বিষয় হলো, এই যে GIA হাসান সাব্বাহ এর মতো রক্তপিপাসু ড্রাকুলা হয়ে ওঠল, এর পেছনে কারা? আবু মুসআব আস-সূরী বইয়ের শুরু দিকে লিখেছেন, আবু আব্দির রহমান আমীনকে জাওয়াহেরীরা একটা সময় পর্যন্ত সাপোর্ট দিয়ে গেছে। এমনকি আবু কা-তাদা ফিলিস্তীনী এদের এসব হত্যা ও লুন্ঠনের ভূয়সী প্রশংসা করে নিয়মিত আর্টিকেল লিখে গেছে। আবু কা-তাদার কাছে তো GIA এর শাসন আব্বাসী, সালাহুদ্দীন আইয়ূবীদের চেয়েও সুশান ছিলো। যা সে প্রায় তার আর্টিকেলে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করত। যার বিবরণ সূরী তার বইয়ে সবিস্তারে এনেছেন। বি-ন লা-দেন, ও জা-ও-য়াহেরীরা এজাতীয় প্রত্যেকটি গ্রুপের প্রায় শুরু থেকে এদের চরম রক্ত-পিপাসু হয়ে ওঠা পর্যন্ত সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত এরা সাধারণ জনগণ ও প্রতিপক্ষ মুসলমানদেরকে হত্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ এরা এদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং সাহায্যও করতে থাকে। কিন্তু যখনই এই জতায়ী সংগঠনগুলো শক্তিশালী হয়ে খোদ মু-জা-হিদদেরকেই হত্যা শুরু করে এবং এগুলো জনসম্মুখে প্রচারিত হয়, তখন তারা নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়ে ঘোষণা দেয়, আমরা এদের এসব কর্মকান্ড থেকে মুক্ত। অথচ মুজা-হিদদেরকে হত্যার আগ পর্যন্ত তারা যেসব অপরাধ করে আসছিল, সেগুলোর মূলনীতি ও ধরণ একই ছিলো। এবং তারা এর নীরব সমর্থকও ছিলো। একই কাজ তারা GIA, আইএস, আশ-শাবাব সহ প্রত্যেকটি সংগঠনের সাথে করে আসছে। জনসাধারণ বা অন্যান্য মুসলমানের আক্রান্ত হওয়ার সময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে নিজেরা আক্রান্ত হলে বা নিজেদের মতের সাথে না মিললে সম্পর্ক ছিন্ন করাটা হলো এই গ্রুপগুলোর বহু পুরনো স্ট্রেটেজি।
এবার আসি, আ-ল-কায়-দা এবং এদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সংগঠন যেমন GIA, আইএস বা আশ-শাবাবদের ‘হাসান সাব্বাহ’ হয়ে ওঠার পেছনের মূল কারণ কী? এদের চিন্তা-চেতনায় এই উগ্রতার মূল উপাদান কোথা থেকে এলো? এরা কি সরাসরি কুরআন - হাদীস থেকে এগুলো পেয়েছে নাকি কারও নির্দিষ্ট ফিলোসফি বা দর্শনের কারণে এরা বিভিন্ন সময় ‘হাসান সাব্বাহ’ হয়ে ওঠছে?
এই প্রশ্নটি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর উত্তরে আমাদের সামনে দু’টি নাম বার বার ওঠে আসে। আর মজার বিষয় হলো, উপরের সবগুলো সংগঠন এবং এদের বাইরেও এই মতবাদের যতো অনুসারী আছে, তারা সকলেই এই দু’টি নামকে তাদের চিন্তা-চেতনা ও তাদের দ্বীন ইসলামের মূল মনে করে থাকে। তারা হলেন,
১। তাদের ভাষায় ‘শেখ আহমাদ’ বা ইবনে তাইমিয়া।
২। ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব নজদী।
এখানে একটি যুক্তি অনেকে পেশ করে থাকেন, অনুসারীদের ভুলের কারণে কি অনুসরণীয় ব্যক্তিকে দোষ দেয়া যায়? যদি এমনই হতো তাহলে তো মুসলমানদের দোষ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, শিয়াদের দোষ আলী রাজি: এর উপর এবং মাজহাবের অনুসারীদের দোষ তাদের ইমামদের উপর দেয়া হতো। এসব ক্ষেত্রে যেহেতু দোষ দেয়া হচ্ছে না, সুতরাং অনুসারীদের ভুলের দোষ অনুসরণীয় ব্যক্তিদের উপর চাপান ঠিক হবে না। এটি হবে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপান। যা খুবই অন্যায়।
এখানে আরেকটি যুক্তি দেয়া হয় এমন, এসব কাজের জন্য ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব নজদীর চিন্তা - চেতনা দায়ী হলেও ‘শেখ আহমাদ’ বা ইবনে তাইমিয়ার এখানে কোন দায় নেই। উনার অনুসরণের নামে উনাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। সমস্ত সমস্যা নজদীর। তাইমীদের কোন সমস্যা নেই। এধরণের মতাদর্শ প্রচার করে থাকেন ইয়াসির কাদি গং। যারা নজদীবাদ ছাড়লেও তাইমীবাদ পুরোপুরি ছাড়তে পারছেন না। এবং তারা নানা ছল-চাতুরী করে নজদীবাদ ও তাইমীবাদকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করে থাকেন।
মৌলিকভাবে আমাদের এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্যই হলো, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যে, ‘শেখ আহমাদ’ (ইবনে তাইমিয়া) কি আসলেই এই বিকৃত সালাফীবাদের মূল নাকি এখানে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপান হচ্ছে? আজকে সারাবিশ্বে নজদী-সালাফীরা যেই ফেতনা করছে, পুরো উম্মতের উপর শিরক-বিদয়াতের সন্ত্রাস চালাচ্ছে, অন্যায়ভাবে তাকফীর - তাবদী করছে, মুসলমানদের রক্ত ও সম্পদ নিয়ে হোলি খেলছে, এগুলোর পেছনে তাইমীবাদের ভূমিকা কতটুকু? মূল ইমাম ঠিক ছিলেন কিন্তু অনুসারীরা বিপথে চলে গেছে নাকি মূল ইমামই সমস্ত ফেতনার মূল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।
উসূলীভাবে এই প্রশ্নের উত্তর বের করা বেশ সহজ। অনুসরণীয় ব্যক্তি বা ইমাম যদি অনুসারীদের চিন্তা-চেতনা থেকে মুক্ত হোন, তাহলে দোষ শুধু অনুসারীদেরই হবে। অনুসরণীয় ব্যক্তি বা ইমামের দোষ দেয়া হবে না। কিন্তু মূল চিন্তা-চেতনার বিকৃতি যদি খোদ অনুসরণীয় ব্যক্তির মাঝে পাওয়া যায়, তাহলে এখানে মূল দোষী হবেন অনুসরণীয় ব্যক্তি। আর তখন অনুসারীদের ভুলের দায় অনুসরণীয় ব্যক্তির উপরও বর্তাবে। এক্ষেত্রে একথা বলার সুযোগ থাকবে না যে, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপান হচ্ছে। এবং অনুসারীদের ভুলের দোষ কেন তাদের ইমামের উপর চাপান হচ্ছে? এই অভিযোগই এখানে অবান্তর।
সুতরাং আমরা পুরো বিষয়টা অনুসন্ধানের চেষ্টা করব যে, নজদী-তাইমী ফেতনার মূলে আসলে কারা? তথাকথিত অনুসারীরা নাকি এদের চিন্তা-চেতনার মূলে যারা রয়েছে তারা? অনুসারীরা মূলত: তাদের অনুসরণীয়দের তাকলীদ করে যাচ্ছে। মূল সমস্যা আসলে তাদের নয়? তারা এই চিন্তা-দর্শনের জনকও নয়? মূল সমস্যা আসলে তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিদের।
একথা অনস্বীকার্য যে ইসলামের হাজার বছর ধরে মূল আকিদা - বিশ্বাস ও চিন্তা - চেতনা সংরক্ষণ করে আসছে আহলে সুন্নতের উলামায়ে কেরাম তথা আশয়ারী-মাতুরিদিগণ। নজদী-তাইমীদের আকিদা দর্শন মূলত: প্রাচীন বাতিল ফেরকা কাররামিয়া, হাশাবিয়াসহ বিভিন্ন দেহবাদী ফেরকার নতুন সংস্করণ। এটি কখনও উম্মাহের মূল ধারার আকিদা ছিলো না। যদিও এরা নিজেদেরকে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের অনুসরণের দাবী করে কিন্তু বাস্তবে এরা হাম্বলী বা আছারী নয়। বরং এরা দেহবাদী - মুজাসসিমা।
এই বিচ্ছিন্ন দেহবাদী চিন্তা-চেতনা যে ইসলামের মূল ধারা থেকে সর্বদা বিচ্ছিন্ন ছিলো, এর সাক্ষী খোদ নজদী-তাইমীরাই তাদের বিভিন্ন লেখনীতে উল্লেখ করেছে। যেমন, নজদী-তাইমী সালাফী শায়খ মুহাম্মাদ বিন রবী আল-মাদখালী ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দী সম্পর্কে লিখেছেন,
كان الأشاعرة يلقبون أنفسهم أهل السنة والجماعة، وكاد يختفي المنهج السلفي منهج أحمد بن حنبل ومن سبقه من أئمة الإسلام، وأصبحت عقيدة السلف غريبة، يعد أتباعها في أنحاء العالم الإسلامي على الأصابع
অর্থাৎ তখন আশয়ারীরা নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাহ উপাধি দিত। সালাফী মানহাজ বা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও পূর্ববর্তী ইমামদের মানহাজ প্রায় বিস্মৃত হতে থাকে। সালাফের আকিদা বিরল বা বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যায়। পুরো বিশ্বে সালাফী আকিদার অনুসারীদেরকে হাতের আঙ্গুল দিয়ে গোনা যেত।
[আল-হুজ্জা ফি বয়ানিল মাহাজ্জা এর উপর তা’লীক, খ: ১, পৃ: ৪০ ]
ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীতেই যদি তথাকথিত সালাফী আকিদা বিরল হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।
একই ধরণের কথা লিখেছেন, নজদী শায়খ সফর আল-হাওয়ালী। তিনি লিখেছেন,
وليكن معلومًا أنّ هذا الرد الموعود ليس مقصودًا به الصابوني ولا غيره من الأشخاص، فالمسألة أكبر من ذلك وأخطر، إنها مسألة مذهب بدعي له وجوده الواقعي الضخم في الفكر الإسلامي، حيث تمتلئ به كثير من كتب التفسير وشروح الحديث وكتب اللغة والبلاغة والأصول، فضلًا عن كتب العقائد والفكر، كما أن له جامعاته الكبرى ومعاهده المنتشرة في أكثر بلاد الإسلام، من الفلبين إلى السنغال
অর্থাৎ এটা জেনে রাখা দরকার যে, আমরা (আশয়ারী-মাতুরিদিদের) যেই খন্ডন লিখছি এর মূল উদ্দেশ্য মূলত: শায়খ সাবুনী বা অন্যান্য নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি নয়। বিষয়টি আরও বড় ও বেশি ভয়ঙ্কর। বরং বিষয়টি একটি বিদয়াতী(?) চিন্তা-ধারা সম্পর্কিত, ইসলামী চিন্তা-চেতনায় যার বিশাল উপস্থিতি রয়েছে যা বাস্তবও বটে। বহু তাফসীর, হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, আরবী ভাষা ও ব্যাকরণের কিতাবাদি, আরবী অলংকার, উসূলের কিতাবাদি সহ অসংখ্য কিতাব এই চিন্তাধারা দিয়ে ভরা। আকীদা ও ইসলামী বিশ্বাসের কথা বাদই দিলাম। এমনকি অধিকাংশ মুসলিম দেশে এই চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত বড় বড় ইউনিভার্সিটি ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেই ফিলিপাইন থেকে শুরু করে সেনেগাল পর্যন্ত একই চিত্র।
[মানহাজুল আশায়েরা ফিল আকিদাহ, পৃ: ৪ ]
উম্মাহের হাজার বছরের আকিদা-বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে সফর আল-হাওয়ালী সাহেব কোন আকিদা জীবিত করতে চাচ্ছেন? অধিকাংশ তাফসীর, হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, অধিকাংশ আরবী ভাষা, উসূলের কিতাব, অধিকাংশ আকিদার কিতাবের বিপরীতে একটি বিচ্ছিন্ন চিন্তা-চেতনাকে জীবিত করে ফেতনা করার প্রয়োজন কেন দেখা দিল তাদের?
একই ধরণের কথা নজদী-তাইমী শায়খ খালিদ আল-গামেদী তার ‘নকজু আকাইদিল আশায়েরা ওয়াল মাতুরিদিয়্যাহ’ কিতাবের ভূমিকায় লিখেছেন। কিতাব লেখার কারণ লিখতে গিয়ে তিনি বলেন,
“ এই কিতাব রচনার মূল প্রথম কারণ হলো, আশয়ারী-মাতুরিদি আকিদা অধিকাংশ মুসলিম দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি এমন হানাফী পাওয়া দুষ্কর যে মাতুরিদি নয়। এমন শাফেয়ী বা মালেকী পাওয়া দুষ্কর যারা আশয়ারী নয়। আহলুস সুন্নাহ ও সালাফের মাজহাব হাম্বলীদের মাঝে সীমিত হয়ে পড়েছে। বরং উল্টো তারা এই সত্য মাজহাবকে দেহবাদী ও হাশাবিয়া হিসেবে আখ্যা দেয়। কারণ, এটি খুবই বিরল হয়ে পড়েছে এবং এর অনুসারীদের সংখ্যাও কমে গেছে। লা হাওলা ওলা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”
শাইখ আব্দুল্লাহ গুনাইমান, শায়খ মুহাম্মাদ বিন রবী আল-মাদখালী, শায়খ সফর আল-হাওয়ালী, শাখ খালেদ আল-গামেদী প্রত্যেকেই একটি বিষয় স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, পুরো উম্মতে মুসলিমার আকিদা বিশ্বাস এক দিকে। আর তাদের এই তথাকথিত সালাফী মানহাজ আরেক দিকে। এই সালাফী মানহাজ একেবারে শুরু থেকে এতো বিরল হয়ে পড়েছে যে, আঙ্গুলের মাথায় এদের অনুসারীদেরকে গোনা যায়। আর এটি যে শুধু এক দুই যুগে হয়েছে এমন নয়, পুরো বার-তের শ’ বছর ধরে এটি চলে আসছে। তথাকথিত এই সালাফী চিন্তা-ধারায় তাদের সনদ হলো এমন, শুরুতে ইবনে আব্দিল ওয়াহাব নজদী। এরপর এক লাফে প্রায় ৪০০ বছর অতিক্রম করে ইবনে তাইমিয়া। আর ইবনে তাইমিয়ার পূর্বে বিভিন্ন দেহবাদী বিচ্ছিন্ন কিছু ফেরকা যেমন কাররামিয়া, সালেমিয়্যাহ, হাশাবিয়্যাহ ইত্যাদি।
একথা তারা কীভাবে চিন্তা করতে পারে যে, পুরো উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হাজার বছর ধরে গোমরাহি ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে আর তাদের বিলুপ্তপ্রায় আকিদাটি একমাত্র হক্ব আকিদা। যেই হক্বের অনুসারীরা আবার সর্বদা ইতিহাসের পাতায় থাকে না, মাঝে মাঝে বুদবুদের মতো ভেসে ওঠে। এই বুদবুদগুলোই সঠিক আর পুরো নদী ও সাগর সব মিথ্যা ও বাতিল। এই চিন্তাটি এক দিকে যেমন হাস্যকর ও অবাস্তব, অন্য দিকে কুরআন-সুন্নাহের সুস্পষ্ট বিরোধী। কারণ, এটি হাদীসে খুবই শক্তিশালীভাবে প্রমাণিত যে, আল্লাহর রাসূলের উম্মত ভ্রষ্টতার উপর একমত হবে না। এই একমত হওয়াটা আবার এক দু’শ বছর নয়, বরং হাজার বছর ধরে ভ্রষ্টতার উপর একমত হয়েছে, এটা বলা সুস্পষ্টভাবে হাদীসের বিরোধিতা। আর যদি ধরেও নেয়া হয়, পুরো উম্মত আশয়ারী-মাতুরিদি হয়ে ভ্রষ্টতা ও বিদয়াতে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল, তাহলে বুদ বুদের মতো মাঝে মাঝে জেগে ওঠা এই তথাকথিত হক্বপন্থীদের কাছে ইসলাম এলো কীভাবে? তাদের কাছে ইসলাম পৌঁছানোর সনদ কী? ইয়াহুদী - খ্রিষ্টানরা কি তাদের কাছে ইসলাম এনে দিয়েছে? নাকি তাদের মতে কাফের, মুশরিক, মুরতাদ, বিদয়াতী ও ভ্রষ্টরাই তাদের কাছে ইসলাম এনে দিয়েছে? আর তাদের ফতোয়া অনুযায়ী আশয়ারী-মাতুরিদিরা যেহেতু সকলেই ভ্রষ্ট, তাদের এনে দেয়া ইসলামই বা কতুটুকু নির্ভরযোগ্য থাকে?
এই প্রশ্নগুলোর বাইরে চলুন দেখা যাক, উম্মতের এই হক্বের বুদ বুদ পুরো উম্মতের সাথে কী ধরণের আচরণ করে তার কিছু নমুনা দেখা যাক।
তথাকথিত এই সালাফী মানহাজের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলেন আল-জেরিওদের ‘শেখ আহমাদ’ বা শায়খ ইবনে তাইমিয়া ( ৬৬১ - ৭২৮ হি:)। ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে ইবনে হাজার আসকালানী রহ: লিখেছেন,
فصار يردّ على صغير العلماء وكبيرهم، قديمهم وحديثهم… وكان لتعصبه لمذهب الحنابلة يقع في الأشاعرة، حتى أنه سب الغزالي فقام عليه قوم كادوا يقتلونه
অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়া ছোট-বড়, বর্তমান ও পূর্ববর্তী সব আলিমদের খন্ডন শুরু করেন। হাম্বলী মাজহাবের প্রতি তার গোঁড়ামীর কারণে আশয়ারীদের নিন্দা - মন্দ করতেন। এমনকি ইমাম গাজালী রহ: কে তিনি গালি দেন। ফলে সেসময়ের লোকেরা তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার উপক্রম হয়।
[আদ-দুরারুল কামিনা, খ: ১, পৃ: ১৭৯ ]
আশয়ারী-মাতুরিদি ইমামগণের সমালোচনায় ইবনে তাইমিয়া খুব বাজে শব্দ ব্যবহার করতেন। তার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিমও খুব বাজে ভাষায় গালি দিয়েছেন তার বিভিন্ন কিতাবে। যেমন আশয়ারীদের সম্পর্কে ইবনে
তাইমিয়া বলতেন,
الأشعرية مخانيث المعتزلة
অর্থাৎ আশয়ারীরা হলো হিজড়া মু’তাজেলী।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ: ৬, পৃ: ৩৫৯]
ইমাম রাজী রহ: কে নানা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মুরতাদ আখ্যা দিয়েছে। পরবর্তীতে আমরা দেখব ইমাম রাজী রহ: এর মতো একজন মহান ইমামকে কত জায়গায় কতো রকম মিথ্যা ও বানান অভিযোগ দিয়ে ইবনে তাইমিয়া তাকে মুরতাদ বলেছেন। নাউজুবিল্লাহ।
তাতারীদের আগ্রাসন প্রতিরোধে আলিমদের মাঝে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন ইজ্জুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম রহ:। তার সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন,
وأبو محمد وأمثاله قد سلكوا مسلك الملاحدة، الذين يقولون إن الرسول لم يبين الحق في باب التوحيد، ولا بين للناس ما هو الأمر عليه في نفسه، بل أظهر للناس خلاف الحق، والحق إما كَتَمه وإما أنه كان غير عالم به
অর্থাৎ আবু মুহাম্মাদ ইজ্জুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম ও তার মতো অন্যরা ধর্মদ্রোহী মুলহিদদের পথ অনুসরণ করেছে। তারা বলে থাকে, তাওহীদের বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য বর্ণনা করে যাননি। এমনকি মানুষকে সঠিক বিষয়টা জানিয়ে যাননি। বরং সত্যের বিপরীতটা প্রকাশ করেছেন। এদের বক্তবয় হয় তিনি সত্য গোপন করেছেন অথবা তিনি সত্য জানতেন না।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ: ৪, পৃ: ১৫৯]
আহলে সুন্নতের বরেণ্য ইমাম ছিলেন, ইমাম গাজালী রহ:। ইমাম আবু বকর বাকিল্লানী, ইমাম আবুল মায়ালী জুয়াইনী রহ, ইমাম আবু বকর ইবনুল আরাবী রহ:। দারউ তায়ারুজিল আকলি ওয়ান নক্বলি এর শুরুতে এই চার ইমামের একটি মূলনীতি এনেছেন। যেই মূলনীতি খন্ডনের জন্য মূলত: তিনি আট-দশ খন্ড লিখলেও সেটি মৌলিকভাবে খন্ডন করতে পারেননি। উনাদের মূলনীতির মত নিজেও একই কথাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেছেন। অথচ কিতাবের শুরুতে আহলে সুন্নতের এই চারজন বিখ্যাত ইমামের নাম উল্লেখ করে তাদের সম্পর্কে লিখেছেন,
وأما هؤلاء فوضعوا قوانينهم على ما رأوه بعقولهم، وقد غلطوا في الرأي والعقل، فالنصارى أقرب إلى تعظيم الأنبياء والرسل من هؤلاء …
অর্থাৎ উপরের চার ব্যক্তি তাদের নিজস্ব আক্বল অনুযায়ী মূলনীতি বানিয়েছে। তাদের চিন্তা ও আক্বলের ক্ষেত্রে তারা ভুল করেছে। আম্বিয়া - কেরাম ও নবী-রাসূলগণের প্রতি খ্রিষ্টানরা এসব আলিমদের থেকে বেশি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে …
[দারউ তায়ারুজিল আকলি ওয়ান নক্বল, পৃ: ৭ ]
ইবনে তাইমিয়ার এই আক্রমণ থেকে বাদ পড়েনি ইমাম বাইহাকী, ইমাম বাজী সহ অন্যান্য বিখ্যাত ইমামগণ। দারউ তায়ারুজিল আকলি ওয়ান নক্বল কিতাবে ‘সিফাত অস্বীকারকারী জাহমী’ দের একটি তালিকা করেছেন তিনি। ‘সিফাত অস্বীকারকারী’ জাহমীদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন ইমাম বাইহাকী সহ আহলে সুন্নতের বরেণ্য ইমামগণ।
‘সিফাত অস্বীকারকারী’ বা ‘নুফাতুল জাহমিয়া’ (জাহমী সিফাত অস্বীকারকারী) দের নিয়ে তার লম্বা আলোচনাটি আমরা মূল কিতাব থেকে নিচে উল্লেখ করছি। দারউ তায়ারুজিল আকলি ওয়ান নক্বলের ৭ম খন্ডে এই তালিকা তিনি পেশ করেছেন। শুরুতেই তিনি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে এর জওয়াব দিয়েছেন,
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, জাহমী-মু’তাজেলীদের মাঝে অধিকাংশ সিফাত অস্বীকারকারীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দ্বীন, কুরআন - সুন্নাহের ব্যাখ্যায় সালাফের বক্তব্য ও আকিদার বিষয়ে তাদের অবস্থান সম্পর্কে কম জ্ঞান রাখত। সিফাত অস্বীকারকারীদের মাঝে তো এমন অনেকেই রয়েছে যাদের এসব বিষয়ে জ্ঞান ছিল?
উত্তর: এসব সিফাত অস্বীকারকারীদের অনেক প্রকার রয়েছে।
১ম প্রকার: এদের আকলিয়াত বা যুক্তিবিদ্যায় তেমন অভিজ্ঞতা ছিলো না। বরং এক্ষেত্রে তারা সিফাত অস্বীকারকারীদের বক্তব্য ও তাদের দলিল গ্রহণ করে থাকে। আর এগুলোকে তারা অকাট্য দলিল মনে করে। এক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব যৌক্তিক সক্ষমতা নেই। বরং তারা মূলত: মুকাল্লিদ। তারা সিফাত অস্বীকারকারীদের বক্তব্যগুলোই বিশ্বাস করে আছে তাদের অনুসরণ হিসেবে। তারা কুরআন - হাদীস, ও সালাফের যতো বক্তব্য শোনে, এর সব কিছুকেই তাদের জানা এই নীতিমালার উপর প্রয়োগ করে। এর বাইরে তারা যায় না। কখনও তারা মনে করে, কুরআন-সুন্নাহের বক্তব্যটি সিফাত অস্বীকারকারীদের দেয়া হুকুমের অনুগামী অথবা তারা এর অর্থকে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করে দেয় ( তাফবীজ করে)।
এই প্রকারের উদাহরণ হলো, আবু হাতিম আল-বুস্তী, আবু সায়াদ সাম্মান আল-মু’তাজেলী, আবু জর আল-হারাবী, আবু বকর আল-বাইহাকী, কাজী ইয়াজ, আবুল ফরজ ইবনুল জাওজী, আবুল হাসান আলী ইবনে মুফাদ্দল আল-মাকদেসী ও অন্যান্যরা।
২য় প্রকার: সিফাত অস্বীকারকারীদের দ্বিতীয় প্রকার হলো, যারা আকলিয়াত বা যৌক্তিক বিষয়ে ইজতিহাদের পথ অবলম্বন করেছে। এবং এক্ষেত্রে অন্যান্য যুক্তিবোদ্ধাদের মত তারাও ভুল করেছে। এবং জাহমিয়াদের বিভিন্ন বাতিল মূলনীতির সাথে একমত হয়েছে। অথচ তাদের এ বিষয়ে সালাফের বক্তব্যের বিষয়ে তেমন জানা-শোনা ছিলো না যেমনটি আহলে সুন্নতের অন্য ইমামদের ছিলো। যদিও তারা বোখারী-মুসলিম সহ অন্যান্য হাদীসের কিতাব সম্পর্কে অবগত ছিলো।
এই প্রকারের উদাহরণ হল, আবু মুহাম্মাদ ইবনে হাজাম, আবুল ওয়ালীদ আল-বাজী, কাজী আবু বকর ইবনুল আরাবী ও অন্যান্যরা।
সিফাত অস্বীকারকারীদের এই প্রকারের মধ্যেই রয়েছে বিশর আল-মিররিসী, মুহাম্মাদ বিন শুজা আল-সালজী ও অন্যান্যরা।
৩য় প্রকার:
যারা হাদীস ও আসার সংগ্রহ করেছে। সালাফের মাজহাবকেও সম্মান করে। কিন্তু তারা জাহমী-কালামীদের বিভিন্ন নীতিমালার সাথে একমত পোষণ করেছে। কুরআন-হাদীস ও আসার সম্পর্কে আহলে সুন্নত ও মুহাদ্দিসীনদের মতো তাদের অভিজ্ঞতা ও জানা-শোনা ছিলো না। সহীহ - জয়ীফ পার্থক্য করার দিক থেকে না আবার সেগুলোর মর্ম উদ্ধারের ক্ষেত্রেও না। তারা ‘সিফাত অস্বীকারকারী জাহমীদের’ বিভিন্ন আকলী উসূলকে সঠিক মনে করেছে এবং এসব উসূলের মধ্যকার স্ববিরোধিতাও উপলব্ধি করেছে।
এই প্রকারের উদাহরণ হলো, আবু বকর ইবনু ফু’রাক, কাজী আবু ইয়া’লা আল-ফাররা, ইবনে আকীল হাম্বলী ও অন্যান্যরা।
এজন্য কখনও কখনও এরা সিফাতের বিষয়ে তা’বীলের পথ অবলম্বন করে। যেমন ইবনে ফু’রাক ও তার মতো অন্যরা মুশকিলুল আসার (স্ববিরোধী হাদীসের পর্যালোচনা) - এ এজাতীয় কাজ করেছেন। কখনও আবার সিফাতের অর্থকে আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করেন ( তাফবীদ করেন)।
আবার কখনও কখনও বলেন, সিফাত তার বাহ্যিক অর্থে থাকবে। যেমনটি করেছেন কাজী আবু ই’য়ালী আল-ফাররা ও অন্যরা।
আবার কখনও তাদের ইজতিহাদ একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। কখনও তারা তা’বীলকে প্রাধান্য দেন আবার কখনও তাফয়ীদকে ( আল্লাহর দিকে অর্থ ন্যস্ত করা)। যেমনটি ইবনে আক্বীল হাম্বলী ও অন্যরা করেছেন।
তারা কখনও কখনও স্ববিরোধী হাদীসের ক্ষেত্রে জাল হাদীসও ঢুকিয়ে দেয়। অথচ তারা জানে না যে, এটি জাল হাদীস। এমনকি এই হাদীসের ভিন্ন একটি শব্দ আছে যা হাদীসের বিরোধকে নিরসন করে দেয়। অথচ তারা এটি জানে না। যেমন কোন হাদীস হয়ত আল্লাহর রাসূলের স্বপ্ন ছিলো তারা মনে করেছে এটি মি’রাজের রাতের ঘটনা।
(৪র্থ প্রকার)
কেউ কেউ আছেন, যাদের জাহমী ও অন্যদের কাছ থেকে নেয়া যৌক্তিক বিষয়ের দক্ষতা আছে। এবং জাহমীদের কোন কোন মূলনীতিতে তারা একমতও হয়েছেন। তবে তারা জাহমী ও অন্যান্যদের সেসব বক্তব্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, যেগুলো আহলে সুন্নতের প্রসিদ্ধ মতের বিপরীত। যেমন, খালকে কুরআ ( কুরআন সৃষ্ট হওয়া বা না হওয়া), পরকালে আল্লাহ তায়ালাকে দেখা। কারণ, সর্ব-সাধারণ সবার কাছে এটি প্রসিদ্ধ ছিলো যে, আহলে সুন্নতের মত হলো, কুরআন আল্লাহর কালাম ও অসৃষ্ট। আর আল্লাহ তায়ালাকে পরকালে দেখা যাবে।
এই দল তখন চেষ্টা করল, আহলে সুন্নত ও মুহাদ্দিসগণের নিকট প্রসিদ্ধ মতামতকে শক্তিশালী করা এবং জাহমিয়াদের কাছ থেকে যেই যৌক্তিক উসূল বা নীতিমালাগুলোকে সঠিক মনে করে নিয়েছিল, এই দু’টির মাঝে সমন্বয় সাধন করতে। তাদের মাঝে কুরআন ও তার মর্মের সুবিস্তার জ্ঞান ও দক্ষতা ছিলো না। আহলে সুন্নতের ইমাম ও মুহাদ্দিসগণের তুলনায় তাদের হাদীস ও সাহাবীদের বক্তব্যের ব্যাপারেও তাদের জানা-শোনা ও দক্ষতার স্বল্পতা ছিলো। তখন তারা মুহাদ্দিস ও জাহমিদের একটি সমন্বিত মাজহাব গড়ে তোলেন। অথচ উভয় দল ( মুহাদ্দিস ও জাহমীরা) তাদেরকে স্ববিরোধিতার অভিযোগ করে থাকে।
এটি ছিলো আবুল হাসান আশয়ারী ও তার অনুসারীদের পথ ও পন্থা। যেমন কাজী আবু বকর বাকিল্লানী, আবু ইসহাক ইস্ফ্রাইনী ও অন্যরা।
তারা যেহেতু উভয় মাজহাবের মধ্যে সমন্বয় করেছেন, এজন্য তাদের মাঝে দেখবা তাদের সবচেয়ে ভালো আলিম যেমন আবুল হাসান আশয়ারী যখন আহলে সুন্নত ও মুহাদ্দিসদের মত উল্লেখ করে তখন খুব সংক্ষেপে উল্লেখ করে। তিনি যতটুকু প্রয়োজন মনে করেন ততটুকু উল্লেখ করে মনে করেন, তিনি মুহাদ্দিসগণের পুরো মতটিই উল্লেখ করেছেন। এর বিপরীতে যখন কালামীদের বক্তব্য যেমন মু’তাজিলা ও অন্যান্যদের মতামত উল্লেখ করেন, তখন অত্যন্ত নিপুণতার সাথে সুবিস্তারে তা তুলে ধরেন।
মু’তাজিলা ও অন্যান্যদের স্ববিরোধিতা ও তাদের ভুল-ভ্রান্তি জানতে এদের আলোচনা উপকারী। তবে আল্লাহর রাসূলের আনীত দ্বীন ও সাহাবা ও তাবেয়ীদের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ত্রুটিপূর্ণ।
নতুবা তারা যদি আসার, সাহাবা-তাবেয়দীর অবস্থান, আল্লাহর রাসূলের আনীত দ্বীন সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকত এবং এগুলোর বিপরীত বিষয়ে সুধারণা না রাখত, তাহলে তাদের দলে (জাহমী-মু’তাজেলীদের) কখনও ভিড়ত না। কারণ, এক্ষেত্রে তারা হয়ত সামগ্রিকভাবে ধারণা রাখে যে, এসব বিদয়াতীরা অকাট্যভাবে রাসূলের বিরোধী। আর এটা তো সবার জানা যে, যে রাসূলের সা: বিরোধিতা সে পথভ্রষ্ট। বিদয়াতীদের বিষয়ে এধরণের সামগ্রিক বিশ্বাস রাখতেন অধিকাংশ মুহাদ্দিস।
অথবা তারা এই সামগ্রিক বিশ্বাসের পাশাপাশি এসব বিদয়াতীদের বাতিল চিন্তা-চেতনা ও স্ববিরোধিতা সুবিস্তারেও হয়ত জানত। যেমনটি বড় বড় মুহাদ্দিসরা জানতের। যাদের মত অন্যরা জানত না। যেমন, ইমাম মালেক, আব্দুল আজিজ মাজিশুন, হাম্মাদ বিন জায়েদ, হাম্মাদ বিন সালামা, সুফইয়ান বিন উয়াইনা, ইবনুল মুবারক, ওকী ইবনুল জাররাহ, আব্দুল্লাহ ইবনে ইদ্রীস, আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী, মুয়াজ বিন মু’য়াজ, ইয়াজীদ বিন হারুন আল-ওয়াসেতী, ইয়াহইয়া বিন সাইদ আল-কাত্তান, সাইদ বিন আমের, শাফেয়ী, আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক বিন ইব্রাহীম, আবু আব্দির রহমান কাসেম সাল্লাম, মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল আল-বোখারী, মুসলিম বিন হাজ্জাজ নাইশাপুরী, উভয় দারেমী, আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান, উসমান বিন সাইদ, আবু হাতেম ও আবু জুরয়া রাজী, আবু দাউদ সিজিস্তানী, আবু বকর আসরম, হারব, আল-কিরমানী। এরকম আরও অসংখ্য ইমাম, যাদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ গণনা করতে পারবে না। যারা ছিলেন ইসলামের ইমাম, নবীর উত্তরাধিকারী ও রাসূলের খুলাফা।
উপরের সকলেই ‘সিফাত অস্বীকারকারীদের’ বিরোধিতায় একমত ছিলেন। যেমনটি তারা ও তাদের বাইরে সালাফের অন্যান্য ইমাম থেকে অসংখ্য আসার তাওয়াতুরের সাথে বর্ণিত হয়েছে। আর এ বিষয়ে তাদের মাঝে কোনও বিরোধ নেই।
[দারউ তায়ারুজিল আকলি ওয়ান নক্বলি, খ: ৭, পৃ: ৩২-৩৭ ]
এই ছিলো সালাফীদের শেখ আহমাদ বা ইবনে তাইমিয়ার ভাষায় ‘সিফাত অস্বীকারকারী জাহমীদের’ তালিকা। এই তালিকা থেকে মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেছে, ইবনে তাইমিয়ার মতে দু’শ তিন শ’ হিজরী পর্যন্ত মুহাদ্দিসরা ছাড়া পরবর্তী আহলে সুন্নতের প্রায় সকলেই ‘সিফাত অস্বীকারকারী জাহমী’ ছিলো অথবা জাহমীদের মূলনীতির সাথে একমত ছিলেন। আর যেসব মুহাদ্দিসদের নাম উল্লেখ করে নিজের দল ভারী করার চেষ্টা করেছেন, তারা কতুটুকু তার মতের পক্ষের ছিলেন, সেটাও বিবেচ্য। একথা হলফ করে বলা যায়, উপরের মুহাদ্দিসদের মাঝে কিছু কিছু হাশাবিয়া বা দেহবাদ প্রভাবের বাইরে কেউ-ই ইবনে তাইমিয়ার পক্ষের নন। অধিকাংশ থেকেই ইবনে তাইমিয়র আকিদার সুস্পষ্ট বিপরীত আকিদা ও বর্ণনা দেখান সম্ভব। যার বহু বর্ণনা ডক্টর সাইফ আল-আসরীর ‘আল-কাউলুত তামাম’ ও এজাতীয় কিতাবে চলে এসেছে।
মোটকথা, ইবনে তাইমিয়া যেভাবে পুরো উম্মতের উলামায়ে কেরাম ও তাদের অনুসারীদেরকে ‘সিফাত অস্বীকারকারী জাহমী’ বানিয়েছে তা খুবই আশ্চর্যজনক। ইমাম আশয়ারী থেকে শুরু করে ইমাম বাইহাকী, ইবনুল জাওজী, কাজী ইয়াজ সহ মোটাদাগের কেউ-ই ইবনে তাইমিয়ার সিফাত অস্বীকারকারী তালিকার বাইরে নয়। বিষয়টি বেশ আশ্চর্যজনক ও হাস্যকর। দুনিয়ার সকলেই যদি সিফাত অস্বীকারকারী হয়, তাহলে তার দাবী অনুযায়ী প্রাথমিক যুগের মুহাদ্দিসদের পরে সিফাত স্বীকারকারী কারা? হাজার বছর ধরে মুসলমানদের সকলেই কি সিফাত অস্বীকারকারী? লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিমও কোন অংশে কম যান না। আহলে সুন্নতের বরেণ্য ইমাম সাইফুদ্দীন আমিদী রহ: কে ‘সাউরুন কাবীর’ বা বড় ষাড় বা বলদ বলেছেন। সেই সাথে বলেছেন, হাকীরুশ শান বা খুবই নিচু পর্যায়ের লোক। আরও একটি অপবাদ যোগ করেছেন এই বলে যে, ইমাম আমিদী আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। ইবনুল কাইয়্যিমের এই আদবের সাথে তার কিতাব ‘নু’নিয়ার’ ব্যাখ্যাকার সালাফী শায়খ খলিল হাররাস ইমাম আমিদীর বিখ্যাত আকিদার কিতাব ‘আবকারুল আফকার’ কে নাম দিয়েছেন ‘আবয়ারুল আফকার’। যার অর্থ হলো, চিন্তা-চেতনার গরুর লাদি। এই হলো বড় বড় ইমামদের সাথে নজদী-তাইমীদের আদব ও ব্যবহার।
এই পর্বে এতটুকুই। পরবর্তী পর্বে ইনশা আল্লাহ নজদী-তাইমীদের অপবাদ ও জুলুমের আরও অনেক উপাখ্যান থাকবে ইনশা আল্লাহ। বিশেষ করে, ইবনে তাইমিয়া ইমাম রাজী রহ: এর উপর কতো জায়গায় কীভাবে মিথ্যাচার করে তাকে মুরতাদ আখ্যা দিয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণও ইনশা আল্লাহ পেশ করব।
------ ------
আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।
© COPYRIGHT 2021 - Hasbi Academy - We Love Our Students