ইলম

বেদয়াতের কবলে নবীজীর নামায (পর্ব-৩)

ইজহারুল ইসলাম শুক্র, 10 সেপ্টে., 2021
15

হাদীসের দৃষ্টিকোণ থেকে পায়ের সাথে পা মিলানো:

মূল আলোচনা শুরুর পূর্বে কিছু পরিভাষা সম্পর্কে আলোচনা জরুরি।আমাদের এই আলোচনা বোঝার জন্য নিচের আরবী কিছু শব্দের অর্থ ও পরিচিতি জানা আবশ্যক।

১. গলা: আরবী ভাষায় গলার আরবী হলো, উনুকুন (عنق) এর বহুবচন হলো, আ’নাকুন (أعناق)। হাদীসে বহুবচন আ’নাক ব্যবহৃত হয়েছে। ইংরেজীতে একে নেক বলে। আরবী যে কোন ডিকশনারী থেকে দেখে নিতে পারেন, গলার আরবী কী? অথবা উনুকুন শব্দের অর্থ গলা কি না। নীচে উনুকুন বা গলার একটি চিত্র দেয়া হলো।

২. হাটু: আরবী ভাষায় হাটুর আরবী হলো, রুকবাতুন (ركبة)। যে কোন আরবী অভিধান দেখে আপনিও বের করে নিতে পারেন। নীচের চিত্র দেখুন।

৩. টাখনু বা গোড়ালী: মানুষের পায়ের পিছনে যে উত্থিত হাড় থাকে, একেই টাখনু বলেন। টাখনু এর আরবী হলো, কা’বুন(كعب)।  চিত্র দেখুন,

৪. কাধ: কাধের আরবী হলো,  মানকিবুন (منكب)। এর বহুবচন হলো, মানাকিবুন (مناكب)। যে কোন আরবী অভিধান দেখে নিশ্চিত হতে পারেন। চিত্রে কাধের পরিচয় দেয়া আছে।

সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে হাদীসগুলো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ছাপা হাদীসের কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ইসলামী ফাউন্ডেশনের অনুবাদ দেখে তো পুরো হতবাক। এতো জগা-খিচুড়ী অনুবাদ তারা কীভাবে ছেপেছে? ইসলামী ফাউন্ডেশনের ভুল ধরা মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং রাসূল স. এর হাদীসের মৌলিকত্ব ঠিক রাখার জন্য তাদের ভুল নিয়ে আলোচনা করা একান্ত জরুরি। শুধু পায়ের সাথে পা মিলানোর হাদীসগুলোর ক্ষেত্রে তারা কতগুলো ভুল করেছে, স্বচক্ষে দেখুন।

হাদীস অনুবাদে ইসলামী ফাউন্ডেশনের ভুল:

ভুল-১:

আবু দাউদ শরীফের ৬৬৭ নং হাদীসের অনুবাদে ইসলামী ফাউন্ডেশন মারাত্মক ভুল করেছে। এখানে রাসূল স. বলেছেন, তোমরা গলার সাথে গলা মিলিয়ে দাড়াও। ইসলামী ফাউন্ডেশন এর অনুবাদ করেছে, তোমরা কাধে কাধ মিলিয়ে দাড়াও। একই ভুল তারা নাসাফী শরীফের ১ম খন্ড ৩৬৭ পৃষ্ঠার ৮১৬ নং হাদীসের ক্ষেত্রেও করেছে। তাদের ভুল দু’টি স্বচক্ষে দেখুন:

ভুল-২:

ইসলামী ফাউন্ডেশন আরেকটি জগা-খিচুড়ী অনুবাদ করেছে আবু দাউদ শরীফের ৬৬২ নং হাদীসের ক্ষেত্রে। এখানে রাসূল স. এর হাদীসে রয়েছে, অত:পর আমি মুসল্লীদেরকে কাধের সাথে কাধ, হাটুর সাথে হাটু এবং পায়ের টাখনুর সাথে টাখনু মিলিয়ে দাড়াতে দেখেছি। এখানে হাটুর সাথে হাটু মিলানোর অনুবাদ করেছে, পায়ে পা মিলিয়ে দাড়াতে দেখেছি। এধরনের ভুল অনুবাদ আমাদের দেশের স্বশিক্ষিত ভাইদের জন্য অশনি সংকেত। যারা আরবী ভাষা, হাদীস ও ফিকহের মূলনীতি ছাড়া ইসলামিক ফা্উন্ডেশনের অনুবাদ কিনে নিজেদেরকে মহা পন্ডিত মনে করছে, তাদের পান্ডিত্যের জন্য এসব ভুল আসলেই অশনি সংকেত।

হাদীসে কী কী মেলানোর কথা আছে?

কাতার সোজা করা বা পরস্পর মিলে মিলে দাড়ানোর ক্ষেত্রে অনেকগুলো হাদীস রয়েছে। হাদীসগুলোতে শুধু পায়ের সাথে পা মিলানোর কথা নেই। বরং নীচের অঙ্গগুলো পরস্পর মিলিয়ে দাড়ানোর কথা রয়েছে।

১. গলার সাথে গলা মিলানো: আবু দাউদ শরীফের ৬৬৭ নং হাদীস ও নাসায়ী শরীফের ৮১৬ নং হাদীসে গলার সাথে গলা মিলিয়ে দাড়ানোর কথা রয়েছে।

২. কাধে কাধ, হাটুর সাথে হাটু ও পায়ের টাখনুর সাথে টাখনু মিলানো:

আবু দাউদ শরীফের ৬৬২ নং হাদীসে হযরত নু’মান ইবনে বাশীর রা. এর হাদীসে কাধে কাধ, হাটুর সাথে হাটু ও পায়ের টাখনুর সাথে টাখনু মিলানোর কথা রয়েছে।

৩. বোখারী শরীফে হযরত নু’মান্ ইবনে বাশীর রা. এর হাদীসে টাখনুর সাথে টাখুন মিলানোর কথা রয়েছে। এবং হযরত আনাস রা. এর হাদীসে পায়ের সাথে পা মিলানোর কথা রয়েছে।

এসব হাদীস থেকে নামাযে মোট পাচটি জিনিস মিলিয়ে দাড়ানোর কথা রয়েছে,

১. গলার সাথে গলা।

২.কাধের সাথে কাধ।

৩. হাটুর সাথে হাটু।

৪. টাখনুর সাথে টাখনু।

৫. পায়ের সাথে পা

আহলে হাদীসরা কী আমল করে?

আমাদের দেশের আহলে হাদীস ভাইয়েরা রাসূর স. এর হাদীসের কোন আংশে আমল করে না। এদের অধিকাংশ পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুলের সাথে অন্যের পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুল স্পর্শের চেষ্টা করে। কনিষ্ঠ আঙ্গুল মিলিয়ে দাড়ানোর কথা আদৌ কোন হাদীসে নেই। মানুষের পায়ের সামনের দিক পেছের দিক থেকে বেশ চওড়া ও প্রশস্ত। পায়ের সাথে পা মিলানোর ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পায়ের এই প্রশস্ত অংশ মিলে যায়। কিন্তু গোড়ালীর দিকের  অংশ ফাকা থেকে যায়। আর যদি গোড়ালীর দিকের অংশ মিলিয়ে দাড়াতে যায, তাহলে পা কেবলামুখী থাকে না। পা বাকা হয়ে কেবলা থেকে সরে যায়। অথচ নামাযে অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেবলামুখী রাথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

মোটকথা, আহলে হাদীস ভাইয়েরা নামাযে দাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনভাবেই হাদীসের উপর আমল করে না। প্রথমত: গলার সাথে গলা মিলানো, কাধের সাথে কাধ মিলানো, হাটুর সাথে হাটু মিলানো এবং গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলানোর ক্ষেত্রে তাদের একজনও এগুলোর উপর আমল করে না। অর্থাৎ তারা মোট চারটি সুন্নত ছেড়ে রীতিমত ছেড়ে দিয়ে থাকে। পায়ের সাথে পা মিলাতে গিয়ে পায়ের অগ্রভাগ মিলিয়ে দাড়ায়, অথচ রাসূল স. এর হাদীসে টাখনুর সাথে টাখনু মিলিয়ে দাড়ানোর কথা আছে। তাদের কেউ যদি একই সাথে টাখনু ও পায়ের অগ্রভাগ মিলিয়ে দাড়ায়, তাহলে সে আরেকটা সুন্নতের বিপরীত করে। অর্থাৎ এ অবস্থায় তার পা কেবলা থেকে সরে যায়। সুতরাং আহলে হাদীসরা এ মাসআলা মোট ছয়টি সুন্নতের বিপরীত আমল করে। যথা-

১. তারা গলার সাথে গলা মিলিয়ে দাড়ায় না। অথচ আবু দাউদ ও নাসায়ী শরীফের হাদীসে গলার সাথে গলা মিলিয়ে দাড়ানোর নির্দেশ রাসূল স. দিয়েছেন।

২. তারা কাধের সাথে কাধ মিলিয়ে দাড়ায় না। অথচ এ সংক্রান্ত প্রায় প্রত্যেকটা হাদীসে কাধের সাথে কাধ মিলিয়ে দাড়ানোর কথা আছে। তারা উভয় কাধের মাঝে এতো বেশি ফাকা রাখে যে এর মাঝে অন্তত: দু’জন শয়তান দাড়াতে পারবে। (হাদীসের ভাষ্য অনুযাযী। কারণ হাদীসে রাসূল স. বলেছেন, উভয় ব্যক্তির মাঝে ফাকা থাকলে সেখানে শয়তান প্রবেশ করে)।

৩. তাদের কেউ কখনও হাটুর সাথে হটু মিলিয়ে নামায পড়ে না। তারা এ হাদীসের উপর কখনও আমল করে না।

৪. তাদের কেউ কখনও টাখনু বা গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলিয়ে দাড়ায় না। সুতরাং তারা এক্ষেত্রে সুন্নতের উপর আমল করে না।

৫. নামাযে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাড়ালে অবশ্যই সেটি কেবলা থেকে সরে যাবে। এভাবে পা বাকা করে নামায পড়া সুন্নতের খেলাফ। অথচ তারা এভাবেই নামায আদায় করে থাকে।

৬. তারা সিজদার সময় পা গুটিয়ে সিজদা করে থাকে। তখন আর তারা পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রাখে না। এ অবস্থায় তাদের বক্তব্য অনুযায়ী তারা সুন্নতের খেলাফ আমল করে।

৭. সিজদা থেকে দাড়িয়ে তারা পায়ের সাথে পা মিলানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এবং নামাযে প্রত্যেক রাকাতে পায়ের জায়গা পবিবর্তন করে থাকে। এভাবে নামাযে নড়া-চড়া করা সুন্নতের খেলাফ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের ধীর-স্থিরভাবে নামায আদায় করতে বলেছেন। অথচ খুশু-খুজুর বিপরীতে তারা প্রত্যেক রাকাতে তারা পায়ের জায়গা পরিবর্তন করে এবং এর জন্য নামাযে নড়া-চড়া করে থাকে।

ড. বকর আবু যায়েদের বিশ্লেষণ:

সৌদি সর্বোচ্চ মুফতী বোর্ডের সদস্য ড. বকর আবু যায়েদ তার “ লা জাদিদা ফি আহকামিস সালাহ” ( নামাযের মাসআলায় কোন নতুনত্ব নেই) বইযে পায়ের সাথে পা মিলানোকে একটি নতুন সৃষ্ট আমল বলেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে নতুন সৃষ্ট এ আমলের সাথে রাসূল স. এর সুন্নাতের কোন সম্পর্ক নেই। ড. বকর আবু যায়েদ লিখেছেন,

“কাতারের নিজের পা পাশের ব্যক্তির পায়ের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে রাখা যেন তা পুরোপুরি সেটে থাকে, এরূপ করাটা প্রকাশ্য ভুল। এক ধরনের বাড়াবাড়ি এবং একটা নব্য ধারণা (বিদয়াত)। এর দ্বারা সুন্নাহ পালনে এক ধরনের গোড়ামী, বাড়াবাড়ি ও অহেতুক বিরক্তির সৃষ্টির হয়। শরীয়তবিরোধী বিষয়কে শরীয়ত মনে করে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকা হয়। এছাড়াও মুসল্লীদের কাতারের মাঝে ফাকা জায়গা সৃষ্টি করা হয়। কাজেই এটা সুন্নতের নামে বাড়াবাড়ি, যা শরীয়ত অনুমোদন করেনি।

দ্বিতীয়ত: রাসূল স. যেমন কাধ ও গোড়ালী মিলিয়ে দাড়াতে বলেছেন, একইভাবে গলার সাথে গলা মিলিয়ে দাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন নাসায়ী শরীফে (হাদীস নং ৮১৪) হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত হাদীস রয়েছে। রাসূল স. এর এসকল নির্দেশের অর্থ হলো, কাতার সোজা করবে, বরাবর দাড়াবে, আকা-বাকা করবে না এবং কাতারের মাঝে ফাকা রাখবে না। কিন্তু এসব নির্দেশ থেকে কখনও এটা প্রমাণিত হয় না যে, বাস্তবিক রাসূল স. এসব অঙ্গ স্পর্শ করে দাড়াতে বলেছেন। কেননা গলার সাথে গলা মেলানো অসম্ভব। সব সময় কাধের সাথে কাধ মিলিয়ে রাখাটাও এক ধরনের অস্বাভাবিক ব্যাপার। তেমনি হাটুর সাথে হাটু মেলানো অসম্ভব। দাড়ানো অবস্থায় গোড়ালী সাথে গোড়ালী মেলানোও সাধারণত সম্ভব নয়। এগুলো পরস্পর মেলানো যেমন অসম্ভব তেমনি নামাযে এগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকাটাও শরীয়ত পরিপন্থী।

সুতরাং স্পষ্ট বিষয় হলো, গলা, কাধ, হাটু ও গোড়ালী মেলানো একই পর্যায়ের। এগুলো দ্বারা রাসূল স. এর মূল উদ্দেশ্য হলো, কাতার সোজা করার প্রতি উদ্বৃদ্ধ করা, কাতারকে বরাবর ও সামন্তরাল করা। কাতারের কোথাও আকা-বাকা বা বক্রতা না থাকা। সেই সাথে কাতারের মাঝে ফাকা না রাখা। এটিই মুলত: রাসূল স. এর বক্তব্যের উদ্দেশ্য।

ড. বকর আবু যায়েদ আরও লিখেছেন,

“ ইমাম বোখারী রহ. তার কিতাবে অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন,

কাধের সাথে কাধ ও পায়ের সাথে পা মেলানোর অধ্যায়। নু’মান ইবনে বাশীর রা. বলেন, আমি আমার এক সাথীকে দেখেছি, সে তার সাথীর পায়ের গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলিয়েছে”।

ইমাম বোখারী রহ.এর এই শিরোনাম সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার আসকানী রহ. বলেন,

এর দ্বারা বাস্তবে পায়ের সাথে পা মেলানো উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো,  কাতার সোজা করার ব্যাপার অধিক গুরুত্ব প্রদান এবং কাতারের মাঝে ফাকা জায়গা বন্ধের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান।

[ফাতহুল বারী, খ.২,পৃ.২৪৭]

ইমাম বোখারীর শিরোনাম সম্পর্কে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. যে ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন এটি সঠিক। এর প্রমাণ হলো, ইমাম বোখারী রহ. হযরত নু’মান ইবনে বাশীর রা. এর যে আংশিক হাদীস উল্লেখ করেছেন, ইমাম আবু দাউদসহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এর পূর্ণরুপ উল্লেখ করেছেন। যেমন আবু দাউদ (হাদীস নং ৬৪৮)   ইবনে খোজাইমা (হাদীস নং ১৬০) ও দারে কুতনী ( খ.১, পৃ.২৮২)। সকলেই হযরত নু’মান ইবনে বাশীর রা. এর হাদীস উল্লেখ করেছেন এভাবে,

“ আমি কোন কোন ব্যক্তিকে দেখেছি, তারা কাধের সাথে কাধ, হাটুর সাথে হাটু এবং গোড়ালীর সাথে গোড়ালী লাগিয়েছ”। এটি আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হাদীসের শব্দ। বাহ্যত: হাটুর সাথে হাটু মেলানো অসম্ভব। সুতরাং স্পষ্ট বোঝা যায়, এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কাতার সোজা করা, বক্রতা না রাখা এবং ফাকা জায়গা না রাখা। বাস্তবে অঙ্গগুলোকে অন্যের অঙ্গের সাতে স্পর্শ বা মিলানো উদ্দেশ্য নয়”।

মূল বইযের স্ক্রিনশট:

সারকথা হলো, রাসূল স. কখনও উম্মতকে অসম্ভব জিনিসের নির্দেশ দিতে পারেন না। রাসূল স. নামাযে এমন কোন জিনিসকে সুন্নত বলেননি যেটা পালন করা অসম্ভব, যেটা অস্বাভাবিক ও বিরক্তিকর। আমাদের আহলে হাদীস ভাইয়েরা এসব হাদীসের কোন অংশের উপর আমল না করে তারা নতুন একটি বিদয়াত চালু করেছে। তারা গলার সাথে গলা মেলানো, হাটুর সাথে হাটু, গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মেলানোর কথা আদৌ বলে না। এমনকি তাদের দু’জন মুসল্লীর কাধের মাঝে এতো বেশি ফাকা থাকে যে, অনায়াসে এক ব্যক্তি সেখানে দাড়াতে পারে। এভাবে রাসূল স. এর অনেকগুলো সুন্নত থেক মুখ ফিরিয়ে নতুন বিদয়াত চালু করার কী অর্থ আছে?

শরীয়তে রাসূল স. যেহেতু কোন অসম্ভব কাজের নির্দেশ দিতে পারেন না, অথচ এক্ষেত্রে তিনি অনেকগুলো অসম্ভব নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং এখানে নির্দ্বিধায় বলা যায়, রাসূল স. এসব শব্দ বাস্তবে মেলানো উদ্দেশ্য নেননি। বরং এগুলো ব্যবহার করে তিনি কাতার সোজার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। আহলে হাদীস ভাইয়েরা যদি গোড়ামী করে তাদের বিদয়াত চালু রাখতে চায়, তাহলে তাদেরকে বলবো, রাসূল স. যেভাবে নামায পড়তে বলেছেন, সেভাবে দু’রাকাত নামায পড়ে দেখান। গলার সাথে গলা মিলিয়ে, হাটুর সাথে হাটু মিলিয়ে, গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলিয়ে এবং কাধের সাথে কাধ মিলিয়ে তারা যদি দাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের এই বিদয়াতের একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হতো।

ড. বকর আবু যায়েদের বক্তব্য অনুযায়ী নামাযে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাড়ালে যেসব সুন্নাহ বিরোধী কাজ হয়:

১. এটি ইসলামে নতুন সৃষ্ট একটি মতবাদ। সুন্নাহ পালনে নতুন সৃষ্ট এসব মাসআলা অবশ্যই বর্জনীয়।

২. এভাবে দাড়ানোটা এতটা অস্বাভাবিক যে, এতে নিজে যেমন কষ্টের মুখোমুখি হয়, অন্যকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয়।

৩. নামাযে খুশু-খুজুর বিপরীতে পা মিলানো নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়।

৪. উভয় মুসল্লীর মাঝে অস্বাবাবিক পরিমাণ ফাকা জায়গা থাকে। মুসল্লী যখন সিজদায় যায় তখন বোঝা যায় তাদের মাঝে কতো ফাকা জায়গা রয়েছে।

৫. সিজদা থেকে দাড়িয়ে নতুনভাবে পা মেলানোর জন্য পায়ের জায়গা বদল করতে হয়। এর জন্য অনর্থক নড়া-চড়া করতে হয়। এটি কখনও সুন্নাহ হতে পারে না।

৬. সর্বোপরি এভাবে দাড়ানোর কারণে পায়ের অগ্রভাগ কেবলামুখী থাকে না।

৭. নতুন বিদয়াত চালু করতে গিয়ে অন্যায়ভাবে অন্যের পা পাড়ানো হয়। এগুলি সব সুন্নাহ বিরোধী কাজ।

এছাড়া আহলে হাদীসদের মতে মহিলা ও পুরুষের নামায একই রকম। সুতরাং তাদের পুরুষরা যেমন পা চ্যাগিয়ে দাড়ায়, তাদের মহিলারা এভাবে দাড়ায় কি না? তাদের মহিলারা যদি এভাবে দাড়িয়ে থাকে, তাহরে এর চেয়ে নোংরা দৃশ্য আর হতে পারে না। ইসলাম কখনও এধরনের নোংরামি সমর্থন করে না। দ্বিতীয় পর্বে ইবনে বাজ রহ. এর বক্তব্য আলোচনা করা হয়েছে।  তিনি এভাবে পুরুষের দাড়ানোকেই নোংরা বলেছেন। সুতরাং মহিলার দাড়ানো সম্পর্কে কী বলতেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জঘন্য ধোকাবাজি:

কিছু ভাই পায়ের সাথে পা মেলোনোর বিদয়াত চালু করার জন্য জঘন্য ধোকাবাজির আশ্রয় নিয়েছে। তারা কিছু ছবি একেছে, যেখানে কাধে সাথে কাধ ও পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাড়ানোর চিত্র রয়েছে। অথচ এটি একটি মারাত্মক ধোকা। এভাবে ভচি আকা সম্ভব হলেও বাস্তবে নামাযে দাড়ানো অসম্ভব। পায়ের সাথে পা মিলালে অবশ্যই কাধের মাঝে ফাক তৈরি হবে। আর বাস্তবে ছবির পা আর মানুষের পা এক নয়। মানুষ পায়ের অগ্রভাগ মিলালে পিছনের দিকে ফাকা থাকবে। আবার পিছনের গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলালে পা কেবলা থেকে সরে যাবে। সুতরাং এসব ধোকাবাজীর আশ্রয় নিয়ে কখনও একটি বিদয়াতকে সুন্নত বানানো যাবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকে এসব বিদয়াত বর্জন করে সহীহ সুন্নাহের উপর আমলের তৌফিক দান করুন। আমীন।

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 71
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 78
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 683
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 81